অনেক পোশাকশ্রমিকের বেতন-বোনাস এখনো অনিশ্চিত
ঈদের বাকি আর মাত্র তিন কি চার দিন। এখনো অনেক পোশাক কারখানার শ্রমিকই চলতি জুলাই মাসের বেতন ও ঈদের বোনাস পাননি। এর মধ্যে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা দু-তিন মাস ধরেই বেতন পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত পাবেন কি না, সে ব্যাপারেও মালিকদের কাছ থেকে কোনো নিশ্চয়তা পাননি তাঁরা।
ঈদ এলেই নানা অজুহাত েখাঁজেন অনেক পোশাক কারখানার মালিক। এ কারণে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। আন্দোলনে নামেন শ্রমিকেরা। চাপে পড়ে সরকার এবং বিজিএমইএ আশ্বাস ও নির্দেশ দেয়। তার পরও অনেক পোশাক-শ্রমিককেই শেষ পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়েই ঈদ উদ্যাপন করতে হয়। পোশাকশিল্পের এই চিত্রটি কয়েক বছর ধরেই চলছে, এবারও ব্যতিক্রম নয়।
গত বুধবার গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ১২টি কারখানায় ঘুরে দেখা গেছে, দুটি কারখানা বেতন-ভাতা দিয়েছে, পাঁচটির মালিক কবে দেবেন, তা অনিশ্চিত এবং পাঁচটি বেতন দিতে না পারায় দুই মাস ধরে বন্ধ। গাজীপুরে পোশাক কারখানা আছে ৮৯৪টি।
সারা দেশে তিন হাজার ৬৫৫টি পোশাক কারখানা আছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ কারখানা গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বেতন-ভাতা দিয়েছে বলে দাবি করেছেন শিল্প পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুস সালাম। সরকারের ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে ৯০ শতাংশ কারখানা বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘১০ শতাংশ কারখানা নিয়ে আমরা চিন্তিত।’
এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়নি বলে দাবি করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ কারখানা কোনো প্রতিশ্রুতিই দেয়নি। এ বিষয়ে সংগঠনের অভিযোগ, অধিকাংশ কারখানাই চলতি মাসের ১০-১৫ দিনের বেতন এবং বোনাস হিসেবে মূল বেতনের ২০, ৩০ বা ৪০ শতাংশ দিয়েছে।
১৫ জুলাই শ্রম মন্ত্রণালয়ে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বৈঠক করেন। পরে প্রতিমন্ত্রী সংবাদ বিফ্রিংয়ে বলেন, জুন মাসের বেতন ইতিমধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে। চলতি মাসের বেতনের অংশ ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মালিকেরাও এতে সম্মত হয়েছেন।
এর আগে গত মাসে ৫০৬টি পোশাক কারখানায় ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে শিল্প পুলিশ স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। এ ছাড়া পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) গত ২৬ জুন স্বারাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে একটি প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, সাভার, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকার ১২৪টি পোশাক কারখানায় গত মে মাসের বেতন দেওয়া হয়নি।
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিজিএমইএ ভবনের সামনে বেতন-ভাতার দাবিতে মিরপুরের অপসোনিন গ্রুপের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। এর আগের দিন তোবা গ্রুপের এক হাজার ২০০ শ্রমিক বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন মাসের বেতন ও বোনাসের দাবিতে বিজিএমইএ ভবন অবরোধ করে রাখেন। ওই দিন মিরপুরের ফোর উইংস এবং সাভারের হেমায়েতপুরের দস্তগীর অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরাও বিজিএমইএর সামনে একই দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
বিজিএমইএর সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, সাড়ে তিন হাজার কারখানা। ৪৪ লাখ শ্রমিক। বিশাল এই শিল্পকে তো নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। ফলে এই শিল্প যত দিন থাকবে, তত দিন অনিশ্চয়তাও থাকবে। তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায় সব সময়ই লাভ-লোকসান থাকে। তার পরও কারখানার মালিকদের আমরা বলে দিয়েছি, মেশিন বেঁচে হলেও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে হবে। এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ েনই।’
আতিকুল ইসলাম আরও বলেন, মালিকদের বেশির ভাগই শনি ও রোববারের মধ্যে বেতন-ভাতা পরিশোধ করে দেবেন। আশা করছি, ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ কারখানা বেতন-ভাতা নির্ধারিত সময়েই পরিশোধ করবে। তিন-চারটি কারখানায় সমস্যা হতে পারে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ঈদের বোনাস দেওয়ার বিষয়ে এখনো বিশৃঙ্খলা আছে। অনেক মালিকেরই ঈদের আগে বেতন-বোনাস না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএর উচিত বেতন-বোনাস দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া। আর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটি চাপ দিয়ে করিয়ে নেওয়া। এত দিনেও এটি না হওয়াটা দুঃখজনক।
সরেজমিন গাজীপুর: পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানার খোকডাংগি গ্রামের আবদুল হালিম কাজ করেন গাজীপুরের বাড়ইপাড়া এলাকার পাবনা সোয়েটার কারখানায়। স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন কালিয়াকৈর উপজেলার হরিণহাটি এলাকায়। গত জুন মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস না পেয়ে খুবই দুরবস্থায় আছেন।
পাবনা সোয়েটার কারখানার বাইরে গত বুধবার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বলেন, ‘বেতন ও বোনাস না পেলে ঈদ করা হবে না।’ ওই কারখানার শ্রমিক সোহরাব হোসেন ও সিমা আক্তার জানান, মালিক এখনো জানাননি কবে বেতন-বোনাস দেবেন।
একই এলাকার এসএস অ্যাপারেলস লিমিটেডের শ্রমিক আলতাফ হোসেন বলেন, গত জুন মাসের বেতন ও ঈদের বোনাস এখন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি। কারখানা কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। শুক্রবারের মধ্যে বেতন দেওয়া না হলে তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করবেন বলেও জানালেন।
গাজীপুর সদর উপজেলার বাসন সড়ক এলাকার ট্রেডমার্ক ফ্যাশন এলাকার কারখানার শ্রমিক হোসেন মিয়া বলেন, ‘দুই মাস ধরে বেতনের অপেক্ষায় আছি। বুধবার বেতন দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দেয়নি। এখন বেতন ও বোনাস পাচ্ছি কি না, তা অনিশ্চিত।
বুধবার দুপুরে আমরা যখন কারখানার বাইরে হোসেন মিয়ার সঙ্গে কথা বলছি, তখন হঠাৎ খেয়াল করি, পাশেই দুই নারী শ্রমিক ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। কাছে গিয়ে প্রশ্ন করতেই জানা গেল, তাঁরা দুজনই এই কারখানারই শ্রমিক। নাম শরিফন নেছা ও মারিয়া পারভীন। জানালেন, বাড়িভাড়া ও দোকানে বাকি পড়েছে। দিতে না পারলে বাড়িতেও যেতে দেবে না। এদিকে কারখানা থেকে বেতন-ভাতা দেওয়ার কোনো আভাস নেই।
টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকার এলিগেন্স ওরিয়েন্টাল কারখানার শ্রমিক সুলতান মাহমুদ। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর গ্রামে। স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে থাকেন কারখানার পাশেই। তিনি বলেন, বেতন-বোনাসের জন্য এবারের ঈদে বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। এখানেই কোনো রকমে ঈদ করতে হবে।
গাজীপুরের সফিপুর এলাকার গোমতি টেক্সটাইল, সেতারা িনট ওয়ার, সাজিদ িনট ওয়ার, অ্যাপেক্স চেরি টাওয়ার, আফতাব লিমিটেড দুই মাস ধরে বেতন-ভাতা না দিতে পেরে বন্ধ রয়েছে। কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার এল এ গ্রুপের একপি পোশাক কারখানায় তিন মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে না। এ জন্য মঙ্গলবার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস আলমকে পুলিশ আটক করেছে।
জানতে চাইলে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোশারফ হোসেন বুধবার বলেন, গাজীপুরের ৪০ ভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া হয়েছে। বাকি ৬০ ভাগ কারখানায় দুদিনের মধ্যে পরিশোধ করা হবে বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, শ্রম আইনে বোনাসের বিষয়ে স্পষ্ট কিছু না থাকায় মালিকেরা সুযোগ নিচ্ছেন। দেশের সব শিল্পের শ্রমিকেরা মূল বেতনের শতভাগ উৎসবভাতা পেয়ে আসছেন। ব্যতিক্রম কেবল পোশাক খাত। কারখানার মালিকদের মানসিকতার পাশাপাশি আইন সংশোধন ও সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
No comments:
Post a Comment