Wednesday, September 10, 2014

‘পঞ্চম দিনে’র তৃপ্তি আর কতদিন?

সেই একই কাহিনি! টেস্ট ম্যাচ পঞ্চম দিনে নিয়ে গেছে বাংলাদেশ। হারটা যে ব্যবধানেই হোক, ম্যাচটা তো পঞ্চম দিনে গেছে—এটাই তো অনেক কিছু!

২০০০ সাল থেকে ক্রিকেটপ্রেমীরা এই একই বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত। বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচের সময় অনেক দর্শকই পত্র-পত্রিকায় প্রতিবেদনের ভাষা মুখস্থ বলতে পারেন। ‘ইনিংস হার এড়িয়েছে বাংলাদেশ’, ‘পঞ্চম দিনের আশা জাগাচ্ছে বাংলাদেশ’। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট সেই আগের বিন্দুতে আটকে থাকলেও ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশার আয়তন তো বাড়ছে। আর তাই ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন, আর কবে এসব শিরোনামের জাল ছিন্ন করতে পারবে বাংলাদেশ? আর কত বছর ক্রিকেট খেললে এ দেশের ক্রিকেটের গুণগত উন্নতি নিশ্চিত হবে!

সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১৮২ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে হাতড়ে বেড়িয়েছিলেন জুতসই ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে তাঁর ক্রিকেটীয় জ্ঞান-ভান্ডার যেন নিঃশেষ হওয়ার পথে। দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াই করার সম্ভাবনার অপমৃত্যু হওয়ার পর তিনি এখন কী বলবেন! হাথুরুসিংহে বারবারই বলছেন, এত তো খারাপ নয় বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা! তাহলে মাঠে গিয়ে তারা কেন এমন করছে! কেন এমন হাস্যকর ঢংয়ে প্রতিপক্ষকে তারা বিলিয়ে দিয়ে আসছে উইকেট—এসবের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়াটা তাঁর জন্য কঠিন হলেও হতে পারে। তিনি তো মাত্র সেদিন দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এর ব্যাখ্যাটা আসলে কী, সেটা বোধ হয় খুব ভালোভাবে জানেন না বাংলাদেশের ক্রিকেটের নীতি–নির্ধারকেরাও।

টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখার ১৪ বছর পরেও সেই পুরোনো গল্পের পুনরাবৃত্তির ব্যাখ্যা একটাই। এ দেশের ক্রিকেট সঠিক পথে এগোচ্ছে না। পুরো ব্যাপারটাই হতাশ করছে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেনকে। তাঁর মতে, টেস্ট মর্যাদা পাওয়া থেকে এই অবধি আমরা আমাদের ক্রিকেটে চাকচিক্য বাড়লেও আসল জায়গাগুলোতে খামতি রয়েই যাচ্ছে। সে জন্য আগের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ পায়ের তলায় শক্ত মাটি নিয়ে দাঁড়াতে পারছে না।

প্রথম আলোকে গাজী আশরাফ হতাশার সঙ্গেই বললেন, দেখুন, সব দোষ ক্রিকেটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে লাভ নেই। আমরা সংগঠকেরাও এ জন্য সমানভাবে দায়ী। ঘরোয়া ক্রিকেটকে শক্তিশালী করার কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু আদতে সেটা কতটা শক্ত ভিত্তি পেয়েছে, সেটা তো চোখ চেয়েই দেখা যায়। আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে বড় বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করি, কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের উন্নতমানের উইকেট বানিয়ে দিই না। ক্লাব ক্রিকেট করি নাম কাওয়াস্তে। চাকচিক্য নিয়ে আমরা সবাই ব্যস্ত। এই তো গতবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য ঢাকা লিগটা হলো না। সময় এসেছে আন্তর্জাতিক ইভেন্টের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোনিবেশ করার।

খেলোয়াড়দের দোষ পুরোপুরি না দেখলেও জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়েও হতাশ গাজী আশরাফ, প্রতিভায় খামতি থাকতে পারে, কিন্তু নিজের চেষ্টা দিয়েও কিন্তু অনেক কিছু অর্জন করা যায়। আসল কথা হচ্ছে নিজের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নিজের সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে ওঠা একজন খেলোয়াড়ের দায়িত্ব। তাকে চেষ্টা করে যেতে হবে। কিন্তু এই জিনিসটারই তো অভাব দেখি খেলোয়াড়দের মধ্যে। অধ্যাবসায়ের আছে যথেষ্ট ঘাটতি ।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক অধ্যাবসায়ের ঘাটতির উদাহরণও টেনেছেন, নাসিরকেই দেখুন। কী দুর্দান্তভাবেই না শুরু হয়েছিল ওর ক্যারিয়ার। ওকে অন্য রকম মনে হয়েছিল। যে জায়গা থেকে শুরু করেছিল, সেখান থেকে তো ওর আরও ওপরে ওঠার কথা। কিন্তু সেটা ও পারল না। অফ ফর্ম যেতেই পারে কিন্তু সেই অফ ফর্ম কাটিয়ে ওঠার দায়িত্বটা কিন্তু ওরই। কিন্তু সে এখানে নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।

মাঠে খেলোয়াড়দের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিরও ঘাটতি দেখেন আশরাফ, দেখবেন, আমাদের খেলোয়াড়েরা টেস্ট ম্যাচে বিশেষ সময়ে গিয়ে আউট হয়। হয় ফিফটি করার পর, নয়তো মধ্যাহ্নবিরতির আগ দিয়ে, অথবা চা–বিরতির আগে। এটা পরিবর্তন করা সম্ভব যদি কোনো খেলোয়াড় খেলাটার প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলতে পারে। ‘আমি আউট হব না’ এই মনোভাবটা তো থাকতে হবে। তামিম, মুমিনুল, মাহমুদউল্লাহ সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টের দুই ইনিংসে যেভাবে আউট হয়েছে, সেটা আমার কাছে খুবই দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে। প্রথম ইনিংসে মুমিনুল খুব সহজেই, কেবল ইচ্ছে করলেই নিজের ইনিংসটাকে আরও বড় করতে পারত। তামিম খুব ভালো ব্যাট করে ফিফটি পেল কিন্তু এরপর ওর আউটের ধরনটা দেখুন। মাহমুদউল্লাহর কী খুব দরকার ছিল মুশফিকের সঙ্গে দারুণ একটা জুটি গড়ার পর ওই শটটা খেলা? এগুলোই দৃষ্টিভঙ্গি। এগুলো বদলাতে না পারলে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি দেখতে হবে আমাদের।

ঘরোয়া ক্রিকেট সূচিতেও অনেক সমস্যা দেখেন গাজী আশরাফ, দেশের হয়ে যে ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলে, তারা ঘরোয়া ক্রিকেটে কয়টা বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়, এটাও ভেবে দেখা দরকার। আমার মনে হয় তাদের যে ব্যস্ত সূচি, তাতে খুব বেশি হলে পাঁচ–ছয়টার বেশি বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ তাদের কপালে জোটে না। টেস্ট খেলার জন্য যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, সেটাই তো নেওয়ার সুযোগ পায় না খেলোয়াড়েরা। টেস্ট ম্যাচে খেলোয়াড়দের অবস্থা দাঁড়ায় পুকুরে সাঁতার শিখে সমুদ্রে সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামার মতো।

আশরাফের একটা জিজ্ঞাসা আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচিং-স্টাফদের কাজের পরিধি নিয়েও, ‘এই যে আমরা বিদেশি কোচদের নিয়ে আসি, তাঁরা আসলে কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন সেটা নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। কোচরা কী খেলোয়াড়দের বলতে পারেন না যে তুমি এই ধরনের বাজে শট খেলছ, সেটা যদি ভবিষ্যতে খেলো, তাহলে দল থেকে বাদ পড়বে! আমি আসলে বুঝি না। কোচ-টোচ থাকতেও খেলোয়াড়েরা একই ভুলের পুনরাবৃত্তি কীভাবে করে! আমার মনে হয় তাঁরা দৈনন্দিন গতানুগতিক কাজের বাইরে খুব একটা দায়িত্ব পালন করেন না।

সবশেষে গাজী আশরাফের কণ্ঠে বেশ হতাশারই সুর, যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো একটাও নতুন না। বছরের পর বছর ধরে এগুলো আমরা সবাই বলে আসছি। ক্রিকেট সংগঠকেরা সবাই তাঁদের করণীয় সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু কেন যেন কিছুতেই কিছু হয় না। আমরা যদি এখনই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের মান না বাড়াতে পারি, তাহলে কিছুতেই কিছু হবে না। আমাদের ক্রিকেট একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকবে।

No comments:

Post a Comment