Saturday, July 26, 2014

ঈদের আগে তুঙ্গে নীরব চাঁদাবাজি

রাজধানীর মধ্য পাইকপাড়ায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ডিশ সংযোগ ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামানকে (২৩) পেটে ছুরি মারে সন্ত্রাসীরা। মনিরুজ্জামানের ‘অপরাধ’, এক লাখ টাকা চাঁদা দেননি তিনি।
১২ জুলাই রাতে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের রড সিমেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল কাদেরের কাছে ফোন করে ঈদ বকশিশের নামে দুই লাখ টাকা চাঁদা চায় এক সন্ত্রাসী। সেই থেকে তিনি ভয়ে ভয়ে আছেন।
ঈদের আগে কিছুদিন ধরেই এ রকম চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ী বা অন্য শ্রেণির অবস্থাপন্ন মানুষ। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কথা বললে তাঁদের বেশির ভাগই বিপদের ভয়ে নাম প্রকাশ করতে চাননি। পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কায় এঁরা থানায় মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন না। ভয়ে নীরবে চাঁদা দিচ্ছেন।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের প্রথম ২০ দিনে রাজধানীতে প্রায় ২০০ চাঁদাবাজি ও চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে চাঁদাবাজির ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত চাঁদা চাওয়ার ঘটনায় ৫০টি জিডি হয়েছে। পুলিশের ধারণা, রাজধানীতে তিন শর বেশি সন্ত্রাসী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, মামলা করতে গেলে পুলিশ তা না নিয়ে জিডি করতে বলছে। এমনকি জিডি করতে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও আছে। পুলিশ চাঁদা দাবির অভিযোগ স্বীকার করলেও দাবি করছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। অন্যদিকে র্যাব বলছে, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগই নেই।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসীরা সাধারণত ব্যবসায়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন বাড়ির মালিকের কাছে সশরীরে গিয়ে বা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ পরিচয়ে ফোন করে কিংবা চিরকুট দিয়ে চাঁদা চায়। বাড়ির দারোয়ান, পিয়ন বা কর্মচারীদের হাতে চিরকুট ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে থাকে চাঁদা দাবি করা সন্ত্রাসীদের নাম ও ফোন নম্বর।
বৃহস্পতিবার চাঁদাবাজদের ছুরিকাঘাতে আহত মনিরুজ্জামান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ প্রতিবেদককে বলেন, সন্ত্রাসী কবিরের নেতৃত্বে তাঁর কাছে কিছুদিন ধরে এক লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হচ্ছিল। নিরাপত্তাহীনতায় ঘটনার চার দিন আগে তিনি মিরপুর থানায় জিডি করেন। এ সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাঁকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বিষয়টি আমি দেখব, মিট করে দেব।’ মনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, আশ্বাস দিলেও তাঁর জন্য পুলিশ কিছুই করেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মিরপুর থানার ওসি মো. সালাহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ‘মিট করে’ দেওয়ার কথা বলেননি। থানার দুটি দলকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মনিরুজ্জামানের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হবে।
কিছুদিন আগে পাঁচ সন্ত্রাসী পূর্ব তেজতুরী বাজারের বাসিন্দা চিকিৎসক আনিছুর রহমানের নির্মাণাধীন বাড়িতে গিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য চার নির্মাণশ্রমিককে কুপিয়ে আহত করে। তারা চলে যাওয়ার সময় দারোয়ানকে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয়। সন্ত্রাসীরা বলে, ‘এতে আশিক ভাইয়ের মোবাইল নম্বর আছে। বাড়ির মালিক এই নম্বরে আশিক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে যেন চাঁদা দেয়।’
চিকিৎসক আনিছুর রহমানের স্ত্রী সৈয়দা মোবাশ্বেরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, হামলার কিছুক্ষণ পর এক ব্যক্তি ফোন করে সন্ত্রাসী আশিক বলে নিজের পরিচয় দিয়ে চাঁদা চান। চাঁদা না দিলে একমাত্র ছেলেসহ তাঁদের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেন ওই ব্যক্তি। তিনি এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় জিডি করেছেন। মামলা না করে জিডি করেছেন কেন জানতে চাইলে মোবাশ্বেরা বলেন, পুলিশ তাঁর অভিযোগ মামলা হিসেবে না নিয়ে জিডি হিসেবে নিয়েছে।
১১ জুলাই রাতে এক ব্যক্তি মুঠোফোনে খালেক গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এ খালেককে ২০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ী বলেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি প্রতি মাসে সন্ত্রাসী শাহাদতকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দিচ্ছেন। শাহাদতের সহযোগীরা এসে চাঁদা নিয়ে যায়।
পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কাপড় ব্যবসায়ী সুজন আহমেদ জানান, র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত ডাকাত শহীদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লম্বু সেলিম তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চেয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছেনও। তবে থানা-পুলিশ করেননি।
এলাকাভিত্তিক দৌরাত্ম্য: রাজধানীর একেক এলাকায় একেক ছোট-বড় সন্ত্রাসীর নামে চাঁদাবাজি চলছে। কোথাও কোথাও সন্ত্রাসীরা নিজেই চাঁদাবাজি করছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সূত্র জানায়, মিরপুর এলাকায় চাঁদাবাজি হয় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ বিদেশে পলাতক শাহাদতের নামে। তেজগাঁওয়ে সন্ত্রাসী আশিক, পুরান ঢাকায় ‘ডাকাত শহীদের’ সহযোগী মতিন চাঁদাবাজি করে। রমনা, শাহবাগ ও মতিঝিলে চাঁদাবাজি হয় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নামে। পুলিশের সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর ও তাজের অনুপস্থিতিতে (তাজ কারাগারে) কাফরুল থানা এলাকায় চাঁদাবাজি করছে শাহাদতের ঘনিষ্ঠ শাহীন সিকদার ও তার সহযোগীরা। রাজধানীর অন্যান্য এলাকায়ও পলাতক বা কারাগারে আটক সন্ত্রাসীদের নামে তাদের সহযোগীরা চাঁদাবাজি করছে। এ ছাড়া সক্রিয় আছে এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী ও উঠতি সন্ত্রাসীরা।
জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) মীর রেজাউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে টেলিফোনে চাঁদা চেয়ে ভয়ভীতি ছড়ানো হচ্ছে।’
র্যাবের মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। তবে এ ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই আমাদের কাছে।’

No comments:

Post a Comment