Friday, July 25, 2014

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করা হচ্ছে


দেশে প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে জাপানি ‘রেট্রোফিটিং’ প্রযুক্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করার কাজ শুরু হয়েছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘সিএনসিআরপি’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গণপূর্ত বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা এ কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র জানায়, একই প্রযুক্তিতে চট্টগ্রাম ও সিলেট নগরেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে এ কাজ করা হবে। প্রথমে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত ভবন ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করা হবে।
জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই প্রকৌশলীরা গত শনিবার রাজধানী ঢাকায় ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশন ভবনটিকে রেট্রোফিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমিকম্প সহনশীল করার কাজ শুরু করেন। রেট্রোফিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ কাজ করার জন্য কোনো ভবন ভেঙে ফেলার দরকার হয় না।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলেন, ফায়ার সার্ভিসের তেজগাঁও স্টেশন ভবনটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন ভবনটির ‘কলাম জ্যাকেটিং’, ‘স্টিল ফ্রেম বেসিং’ ও ইটের তৈরি ভঙ্গুর দেয়ালে কংক্রিটের দেয়াল জুড়ে দিয়ে একে টেকসই করা হবে। জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, কলাম জ্যাকেটিং হচ্ছে ভবনটির বিদ্যমান কলামগুলোর চারপাশজুড়ে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে সেগুলোকে শক্তিশালী করা। স্টিল ফ্রেম বেসিং হচ্ছে ভবনটির দেয়ালে ইস্পাতের ফ্রেম লাগিয়ে দেওয়া।
সিএনসিআরপি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও বিশেষ প্রকল্প) মো. আবদুল মালেক সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে অসংখ্য পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। এগুলো ভূমিকম্প সহনশীল করার ক্ষেত্রে রেট্রোফিটিং প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয়ের সর্বোচ্চ অর্ধেক অর্থ ব্যয়ে একেকটি ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করা সম্ভব। তিনি বলেন, চার বছর মেয়াদি (২০১১-১৫) সিএনসিআরপি প্রকল্পের অধীনে গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ৩০ জন প্রকৌশলী দেশে ও জাপানে তিন বছর ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন প্রকল্পের চতুর্থ বছরে তাঁরা হাতে-কলমে শুধু সরকারি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো রেট্রোফিটিং করবেন। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও এ কাজ অব্যাহত থাকবে। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগ মোকাবিলায় যেসব সরকারি বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাদের ভবনগুলো অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রেট্রোফিটিং করা হবে। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক ভবন অন্যতম।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক বলেন, তবে গণপূর্ত বিভাগের প্রশিক্ষপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা ইতিমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ৭০ জন প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁরাও এখন কাজ শুরু করবেন। এ ছাড়া জাইকার আর্থিক সহায়তায় পোশাকশিল্পের ভবনগুলো রেট্রোফিটিংয়ের জন্য আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ‘আরএমজি সেক্টর সেইফ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম’ শীর্ষক ওই প্রকল্পের মাধ্যমে পোশাকশিল্পের মালিকদের ঋণও দেওয়া হবে তাঁদের ভবন রেট্রোফিটিং করার জন্য।
ঢাকার আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে পোশাক তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত দুটি ভবন রেট্রোফিটিং করার জন্য ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়ে মালেক সিকদার বলেন, ওই ভবন দুটি ভূমিকম্প সহনশীল করার জন্য কী কী করতে হবে, তা নির্ধারণ করে নকশা প্রণয়নও করা হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ভবন দুটিতে কাজ শুরু করা হবে।
তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা নিরূপণের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো জরিপ চালানো হয়নি।
জাপানি ও দেশের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্প-ঝুঁকির অঞ্চলে। এ দেশের ভেতরে ও আশপাশে বেশ কটি বড় ধরনের ভূ-চ্যুতি রয়েছে, যেগুলো গত ১০০ বছরে বেশ কয়েকটি বিধ্বংসী ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ বছর অন্তর এসব চ্যুতি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হতে পারে। সে হিসাবে বাংলাদেশ ও এর আশপাশের চ্যুতিগুলো থেকে বড় কোনো ভূমিকম্প উৎপত্তির সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও টেকসই ভবন নির্মাণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

No comments:

Post a Comment