দিয়ার দ্বিতীয় জন্মদিন। কেক আনা হয়েছে। কেকের ওপর মোমবাতি। বারবার নিভিয়ে ফেলছে দিয়া। ওর ‘মা’ বলছেন, ‘নিভিয়ো না।’ বলতে না বলতেই আবার ফুঁ। কে শোনে কার কথা!
এরপর ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ গাইতে গাইতে কেক কাটা হলো। দিয়াকে আদর করতে করতে তাকে ঘিরে নাচ শুরু করলেন তাঁর ‘মা-বোনেরা’। সবার মুখেই হাসি।
শ্যামলীর এসওএস শিশুপল্লীর চিত্র এটি। এখানেই ‘মা’ ও ‘বোন’ পরিবেষ্টিত হয়ে বেড়ে ওঠে দিয়ার মতো অনেক শিশু। এটি তাদের কাছে শুধু শিশুপল্লি নয়; শিশুস্বর্গ।
‘মা’ ও ‘বোন’ শব্দ দুটি বন্ধনী চিহ্ন দিয়ে আটকে দেওয়ার মানে হলো, যাদের মা কিংবা বোন মনে করে দিয়ার মতো এখানকার অনেক শিশু বড় হয়, রক্তের সম্পর্কে তাঁরা তাদের মা কিংবা বোন নন। তবে মা-বোনের অভাব তাদের বুঝতে দেওয়া হয় না। শিশুপল্লীর যে নারী কর্মীর হাতে বাচ্চার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়, তিনি তাকে নিজের সন্তান মনে করেই বড় করে তোলেন।
আজ ২৩ জুন সংস্থাটি আন্তর্জাতিক এসওএস শিশুপল্লী দিবস পালন করে। এ উপলক্ষে এসওএসে সারা বাংলাদেশের শিশুপল্লীতে নানা অনুষ্ঠানের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
শিশুস্বর্গের দেবশিশুরা
দিয়ার পুরো নাম আফরিন হাফসা দিয়া। অনেক ভাইবোনের ঘরে জন্ম নেওয়ায় অভাবের কারণে দিয়ার জায়গা হয়নি নিজ পরিবারে। ঠাঁই হয়েছে শ্যামলীর এসওএস শিশুপল্লীতে। ও বেড়ে উঠছে ‘কৃত্রিম’ মা-বোনদের আদরে। কিন্তু দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। নিবিড় মমতায় স্নেহ শীতল পরিবেশে একেকজন ‘মা’ গড়ে তুলছেন প্রিয় ‘সন্তান’কে।
হারম্যান মেইনার স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফিয়া নাসরিন নবনী। জন্মের আধা ঘণ্টা পর তার ঠাঁই হয় শ্যামলীর শিশুপল্লীতে। কোথায় তার বাড়ি, কে তার বাবা-মা, জানে না সে। কিন্তু তাই বলে ওর মনে এতটুকু দুঃখ নেই। সে বলল, ‘এখানে খুব ভালো আছি। মা-বোনদের আদরে আছি। কোনো কিছুরই অভাব নেই।’
চট্টগ্রামের মেয়ে সাজিয়া আফরিন। মা মারা যাওয়ার পর সাত বছর বয়সে এখানে এসেছে ও। এখন সাজিয়া হারম্যান মেইনারে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে বলল, শিশুপল্লীতে থাকতে খারাপ লাগে কম, বেশি সময়ই ভালো লাগে।
সর্বজনীন শিশুপল্লি
আমাদের দেশে সাধারণত এতিমখানা বলতে যা বোঝায় এসওএস শিশুপল্লী তার চেয়ে একদম আলাদা।
এটি একটি বেসরকারি, অরাজনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক শিশুকল্যাণমূলক সংস্থা, স্নেহশীল নিবাস; যা জাতি, ধর্ম ও গোষ্ঠী-নির্বিশেষে পিতৃ-মাতৃহীন ও অসহায় শিশুদের লালন-পালন করে। তাদের আত্মনির্ভরশীল জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুত করে। পরবর্তী জীবনে তারা নানাভাবে সমাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই শিশুপল্লী থেকে বেড়ে উঠে জীবনে সফল হয়েছেন এমন একজন সাকিনা সুলতানা। এখন তিনি ‘ওয়াক ফর লাইফ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে তিনি জন্মগতভাবে যেসব শিশুর পায়ে সমস্যা, তাদের সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি জীবনকে সহজভাবে মেনে নিয়ে বাঁচতে শেখান। তাঁর মতো অনেকে উন্নয়নকর্মী, চিকিত্সক, সরকারি চাকরিজীবী ও প্রবাসে গিয়ে উন্নত জীবনযাপন করছেন।
শিশুপল্লীর ধারণাটি যেভাবে এলো

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে অনেক শিশু মাতৃ-পিতৃহীন হয়ে পড়ে। এ বিষয়টি নিয়ে উদিগ্ন হয়ে পড়েন অস্ট্রিয়ার নাগরিক অধ্যাপক হারম্যান মেইনার। তাঁর মনে বারবার দোলা দিতে থাকে, কী করা যায়। এরপর ১৯৪৯ সালে তাঁর দেশের ইমস্ট নামক এলাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন একটি শিশুপল্লি। পরবর্তী সময়ে নাম হয় এসওএস শিশুপল্লী। প্রধানত মা, ভাই-বোন, বাসস্থান ও শিশুপল্লী এই চারটি নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে সংস্থাটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
ঢাকার শ্যামলী, মিরপুর, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি জায়গা শিশুপল্লি এবং অন্য পাঁচটি এলাকায় যুবপল্লি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসওএস শিশুপল্লীতে এক হাজার ৯৯ জন শিশু লালিত-পালিত হচ্ছে।
২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, এসওএস শিশুপল্লীর প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে ৮২ হাজার ১০০ জনকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সংস্থাটি পরিচালিত হয় হারম্যান মেইনার তহবিল, বিশ্বব্যাপী অসংখ্য বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায়। কেউ সহায়তা করতে চাইলে শিশুপল্লীর নির্ধারিত ফরম পূরণ করে করতে পারেন। সাধারণত চার বছর বয়সী অনাথ ছেলেমেয়েকে শিশুপল্লীতে ভর্তি করে নেওয়া হয়। বাচ্চার আত্মীয় বা অন্য কেউ শিশুপল্লীতে এসে আবেদন করতে পারেন। এরপর তদন্তসাপেক্ষে শিশুটিকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে এর ব্যতিক্রমও আছে। এ ছাড়া কোনো পরিবার বাচ্চাকে কাছে রাখতে চায় অথচ পড়াশোনা করানোর সংগতি নেই; সেসব বাচ্চাকেও সহযোগিতা করে এসওএস।

No comments:
Post a Comment