Wednesday, September 17, 2014

ঘরে ঢুকে মা দেখলেন ছেলে–মেয়ের লাশ ঝুলছে

ছেলে–মেয়েদের চাহিদা মেটাতে সারা দিনই ছুটতে হতো সাংবাদিক জয়শ্রী জামানকে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকেই তাঁর এই যুদ্ধ চলছিল। এ কারণে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন তাঁর দুই ছেলেমেয়েও। সর্বশেষ গত সোমবার কাজ শেষে ঘরে ফিরে সেই দুই ছেলেমেয়েকে ঝুলন্ত¯অবস্থায় দেখলেন এই মা। সেই থেকে জয়শ্রীকে চেতনানাশক দিয়ে রাখা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, সোমবার মাঝরাতে জয়শ্রীর উত্তরার ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মেয়ে চিরশ্রী জামান ওরফে মুনমুন (১৯) ও ছেলে মোহাম্মদ বিন আলীমের (১৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। জয়শ্রী বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় সহসম্পাদক হিসেবে কর্মরত। নিহত চিরশ্রী ইংরেজি মাধ্যম স্কুল থেকে ‘ও লেভেল’ সম্পন্ন করেছেন। আর আলীম নবম শ্রেণিতে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ছে।
উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের গরীবে নেওয়াজ সড়কের একটি নয়তলা ভবনের পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে তিন মাস আগে দুই ছেলে–মেয়েকে নিয়ে উঠেছিলেন জয়শ্রী। ওই ভবনের তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস ব্যাপারী বলেন, সোমবার রাত ১১টার দিকে অফিস থেকে বাসায় ফেরেন জয়শ্রী জামান। ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, বেল বাজালেও কেউ খুলছিলেন না। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের অনুরোধ করে সেদিক দিয়ে তাঁকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে বলেন জয়শ্রী। তিনি ব্যালকনি বেয়ে জয়শ্রীর ফ্ল্যাটে ঢুকে ভেতর থেকে খুলে দেন। তখন জয়শ্রীর দুই ছেলে–মেয়ের কক্ষের বাতি জ্বলছিল। এরপর ভেতরে ঢুকেই ছেলের কক্ষে ঢুকে দেখেন, ছেলে জানালার গ্রিলের সঙ্গে গলায় লাল নাইলনের দড়ি বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে। দেখেই তিনি চিৎকার দেন। দৌড়ে পাশের ঘরে ঢুকে দেখেন, জানালার গ্রিলের সঙ্গে একই রকম দড়ি দিয়ে ঝুলছেন মেয়েও। চিৎকার করে পাগলের মতো কাঁদতে শুরু করেন জয়শ্রী। এরপর পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা এগিয়ে আসেন। উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। লাশ উদ্ধার করে রাত তিনটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় জয়শ্রী জামানের চাচাতো ভাই হাবিবুজ্জামান বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন।
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হারুন অর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রাত নয়টা ২৩ মিনিটে সর্বশেষ জয়শ্রী জামানের সঙ্গে ছেলেমেয়েদের মুঠোফোনে স্বাভাবিক কথা হয়। তার পরই সম্ভবত এ ঘটনা ঘটেছে। জয়শ্রীর দুই ছেলেমেয়ে একটি ফোনই ব্যবহার করতেন। এরপর ওই ফোনে আর কোনো কল আসেনি বা যায়নি। রাত ১১টায় জয়শ্রী বাসায় ঢুকে বিষয়টি জানতে পারেন। দুই ভাইবোন ঘরের পোশাকেই ছিলেন। আলীমের পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট ও কালো টি-শার্ট এবং চিরশ্রীর পরনে ম্যাক্সি ছিল। আলীমের পা মেঝেতে ঠেকানো ও হাঁটু কিছুটা ভাঁজ হওয়া অবস্থায় ছিল। আর চিরশ্রীর পুরো শরীর গ্রিলের সঙ্গে ঝুলছিল।
গানের কথা: পুলিশ জানায়, আলীমের স্কুলের কাজের খাতার পেছনের ছয় পাতাজুড়ে সুইডিশ ব্যান্ড দল ‘হিপোক্রেসি’র একটি ইংরেজি গানের কথা (লিরিক) লেখা ছিল। গানটির শিরোনাম ‘দ্য ডিপারচার’ (ছেড়ে যাওয়া)। গানের কয়েকটি লাইন হলো: ‘আমি জীবনে ফিরেছি নগ্ন এবং মেঝেতে বাঁধা অবস্থায়। আমার চোখের কোণে আমি দেখেছি তাদের দরজা দিয়ে ঢুকতে—সব ছিল সাদা, সব ছিল কালো।... আমি পরপারের দিকে অপলক তাকিয়েছিলাম। আমি যা দেখেছি তা কোনো মানুষ আগে দেখেনি। এবং আমি নিজেকে কেটে উন্মুক্ত রেখেছি, মনে হয় তারা আমার আত্মাকে খুঁজছে।’
বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের হতাশা: তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সবার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে ওই ছেলেমেয়েরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পুলিশ বলছে, তাদের সন্দেহ, এঁরা দুজন মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন এবং এ কারণে মানসিকভাবে স্বাভাবিক ছিলেন না।
জয়শ্রীর পাশের বাসার বাসিন্দা রোখসানা বেগম বলেন, তিন মাস আগে তাঁরা এখানে উঠেছেন। এই সময়ের মধ্যে ওই ফ্ল্যাট থেকে কোনো হইহুল্লোড় বা কোনো ধরনের পারিবারিক অশান্তি তাঁদের নজরে আসেনি। ওই ছেলেমেয়েদের জীবনধারা সম্পর্কেও তাঁদের কোনো ধারণা নেই।
স্বজনেরা জানান, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও জয়শ্রীর চাকরি স্থায়ী হয়নি। সাত বছর আগে স্বামী আলীমুল হকের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকে চাকরির টাকাতেই চলতে হতো তাঁকে। বিচ্ছেদের পর কিছুদিন স্বামী ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু টাকা দিলে পরে তা বন্ধ করে দেন। সেই থেকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে হঠাৎই অর্থকষ্টে পড়ে যান জয়শ্রী। সচ্ছলতার মধ্যে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা হঠাৎই টানাটানির সংসারে পড়ে যান। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়া ছেলেমেয়েদের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হতো জয়শ্রীকে। এ ছাড়া জয়শ্রীর স্বামী আবারও বিয়ে করেছেন। তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যান, ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এসব দেখে জয়শ্রীর ছেলেমেয়েরা আরও হতাশাগ্রস্ত হন। শেষ পর্যন্ত নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তাঁরা।
চিরশ্রী ও আলীমের বাবা আলীমুল হক থাকেন চীনে। তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। আলীমুল হকের পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে পুলিশও যোগাযোগ করতে পারেনি বলে জানিয়েছে।
এই মামলার বাদী জয়শ্রীর চাচাতো ভাই হাবিবুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জয়শ্রীর পরিবারের সঙ্গে তাঁর খুব একটা যোগাযোগ নেই। ছেলেমেয়েদের খবরও তিনি জানেন না। সোমবার রাতে জয়শ্রীর ফোন পেয়েই তিনি এসেছেন।
তবে বাসার তত্ত্বাবধায়ক ইলিয়াস বলেন, প্রতিদিন সকালে বা দুপুরে জয়শ্রী জামান বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হতেন। রাতে ফেরার সময় তিনিই বাজার নিয়ে ঢুকতেন। বেশির ভাগ সময়ই ছেলেমেয়েদের জন্য বার্গার বা পিৎজা-ধরনের খাবার নিয়ে আসতেন জয়শ্রী। নিহত দুই ভাইবোন খুব কম ফ্ল্যাটের বাইরে বের হতেন। তাঁদের কোনো বন্ধুবান্ধবও বাসায় আসতেন না। এমনকি গত তিন মাসে ওই বাড়িতে তাঁদের কোনো আত্মীয়কেও আসতে দেখেননি ইলিয়াস। সর্বশেষ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে চিরশ্রী জামান বাইরে বের হয়েছিলেন সিগারেট কিনতে। তাঁরা দুই ভাইবোনই ক্রমাগত ধূমপান করতেন।
বাসার সামনের একজন চা-সিগারেট বিক্রেতা জানান, দুই ভাইবোন প্রতিদিন দুপুর ১২টার দিকে তাঁর দোকানে সিগারেট কিনতে যেতেন। প্রতিদিন এক প্যাকেট করে মার্লবোরো সিগারেট কিনতেন চিরশ্রী ও আলীম। সোমবার দুপুরেও চিরশ্রী নেমে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে নিয়ে গেছেন। এরপর আর তাঁদের বাইরে দেখা যায়নি।
চিরশ্রী ও আলীম মারা যাওয়ার পর হাসপাতাল মর্গেও তাঁদের আত্মীয় বা বন্ধুদের তেমন দেখা যায়নি। মর্গে জয়শ্রীর সহকর্মী ও একজন আত্মীয়কে পাওয়া যায়। নিহত ছেলেমেয়েদের কোনো বন্ধু সেখানে যাননি। বাসায়ও কোনো আত্মীয় বা বন্ধুকে দেখা যায়নি। বাসা ছিল তালাবদ্ধ। জয়শ্রীকে চেতনানাশক দিয়ে মোহাম্মদপুরে বড় বোনের বাসায় রাখা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment