নূর রেহমান। বয়স ৩০। কাচা-পাকা দাড়ি আর শীর্ণকায় শরীর দেখে মনে হয় যেন অনেক বয়স। বসে আছেন স্বজনদের অপেক্ষায়। বাড়ি ফিরতে চান তিনি।
মাদকাসক্ত নূর রেহমানকে তিন বছর আগে তাঁর ভাই রেখে যান মোল্লা মাওলানা ইলিয়াস কাদরির ক্লিনিকে। সেখানে পোকা-মাকড়ে ভরা কংক্রিটের এক স্ল্যাবের সঙ্গে শেকলে বাঁধা অবস্থায় তাঁকে কাটাতে হয়েছে তিনটি বছর। তাঁর ওপর মারধর চলত প্রতিনিয়ত। খাবারও জুটত না ঠিকমতো। এমনি করতে করতে একসময় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে নূর এখন একজন প্রতিবন্ধী।
নূর বলেন, ‘এখানে আমাদের সঙ্গে তারা পশুর চেয়ে খারাপ ব্যাবহার করত।’ গত শুক্রবার এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উত্তরে পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা হরিপুর শহরে এ ক্লিনিক ভেঙে দেয় পুলিশ। সেখান থেকে পায়ে শেকল বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় ১১৫ জন ‘রোগী’কে উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় ক্লিনিক মালিক কাদরিকে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে নূরের মতো প্রায় ২০ জন তাঁদের পরিবারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যথাযথ আইনি তদারকি না থাকার সুযোগে মানসিক আশ্রয়স্থলের নামে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
ক্লিনিকের বাসিন্দারা যাতে পালাতে না পারেন এবং পুনরায় মাদকাসক্ত না হয়ে পড়েন, সে জন্য সব সময়ই শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন কাদরি। শুধু শৌচাগারে যাওয়ার সময় খুলে দেওয়া হতো বাঁধন।
তাঁরা যদি একটি শব্দও অভিযোগ করতেন তাহলে মোল্লা কাদরি ও তাঁর চার রক্ষী তাঁদের প্রচণ্ড মারধর করতেন।
নূর বলেন, ‘তারা আমাদের নির্যাতন করত বললে ভুল বলা হবে। তাদের নির্যাতনের ফলে রোগীদের মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে।’

দুই বছরের এই বন্দিজীবনের ফলেই আট মাস আগে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে মনে করেন নূর। তিনি বলেন, মানসিক চাপের কারণেই এটি হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চোখের সংক্রমণ হয়েছে।
অন্য রোগীদের মতো নূর এসবের জন্য তাঁর পরিবারকেই দায়ী করেন। নূর অভিযোগ করেন, তাঁর জমি দখল করার জন্যই তাঁর ভাই তাঁকে এখানে রেখে গেছেন।
সাইফুল্লাহ নামে আফগানিস্তান থেকে আসা এক শরণার্থী জানান, এখানে কোনো চিকিত্সা হয় না। শুধু শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।
সাইফুল্লাহ বলেন, ‘দেয়াল তৈরির কাজে যখন আমাদের সহযোগিতা লাগত, তখনই কেবল আমাদের বাইরে নিয়ে যেত।’
অন্যরা জানালেন, রান্নার লোক না এলে তাঁদের রান্না করতে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে বাধ্য করা হতো।
মাদক সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় তা ভয়াবহ আকারে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এ থেকে ব্যতিক্রম নয় পাকিস্তানও। আশির দশক থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তান থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা আফিমের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা গেছে, পাকিস্তানে ৪০ লাখের বেশি মানুষ গাঁজায় আসক্ত এবং আট লাখ ৬০ হাজার মানুষ হেরোইন গ্রহণ করে। ২০০০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
এ অবস্থায় অনেক ক্লিনিকই আদিম চিকিত্সাপদ্ধতি ব্যবহার করে রোগীদের সারিয়ে তোলার প্রস্তাব দেয়।

তবে মোল্লা কাদরির পরিচালিত ক্লিনিকের এক রোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। হরিপুর পুলিশ স্টেশনের হাজতখানায় থাকা কাদরি নির্যাতনের দায়ে জেল জরিমানা হতে পারে জানার পরও তাঁর চিকিত্সার পক্ষে সাফাই গাইছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কোরআন পাঠ করে পানিপড়া দিই। সেই পানি দিনে তিনবার পান করতে হয়। সাধারণত মাদকাসক্তরা মাদক ছেড়ে দিলে প্রথম দিকে তাদের বমি ও খিঁচুনি হয়। কিন্তু সূরা ইয়াসিন পড়ে ফুঁক দেওয়া পানি খাওয়ার পর তাদের এ ধরনের কোনো সমস্যা হয় না। এভাবে এক সপ্তাহ পর কোনো ধরনের ওষুধ ছাড়াই তারা ভালো হয়ে ওঠে।’
আফগান যুবক সাইফুল্লাহ বলেন, ‘মোল্লা আমাদের বেঁধে রাখত ও লাঠি দিয়ে পেটাত। এখানে ইসলামের কিছু নেই।’
২০০৬ সালেও এই মোল্লাকে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে বের হয়ে পুনরায় এই ব্যবসা শুরু করেন। প্রতি মাসে তিনি প্রত্যেক রোগীর পরিবারের কাছ থেকে আট হাজার রুপি নিতেন।
হরিপুর পুলিশ স্টেশনের প্রধান মেহবুব খাব বলেন, রোগীর পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে গেলে—সব ঠিক আছে, বলার জন্য আগে থেকেই রোগীদের শিখিয়ে দেওয়া হতো। না হলে মারধরের হুমকি দেওয়া হতো।
এদিকে কাদরির এই চিকিত্সাপদ্ধতি নিয়ে যেখানে অনেক পরিবারের অভিযোগ, সেখানে আবার অনেক পরিবারের সম্মতিও রয়েছে।
সুলতান নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার ছেলেকে বেঁধে রাখা হতো বলে সে পালাতে পারত না। এটি তার জন্য ভালো ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো সে কোরআন পাঠ শিখেছে।’
নিয়াজ নামের একজন তাঁর ভাই লুতুফকে বাড়ি নিয়ে যেতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের জন্য এই কড়া চিকিত্সাটি প্রয়োজন ছিল। না হলে সে আবারও মাদকে ফিরে যেত।’
কিন্তু লুতুফ অসহায় চোখে শূন্যে তাকিয়ে বলছিল, ‘আমার ভাই পুরো ঘটনা জানে না। আমি জানি সেখানে কী হয়েছে।’

No comments:
Post a Comment