Pages

Monday, November 10, 2014

মন্ত্রিত্ব না ব্যবসা—কোনটা রাখবেন?

চার মন্ত্রীকে সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দায়ে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল পরে সত্যিকার অর্থেই একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নতুন আইনি লড়াইয়ের সূচনা হলো। সংবিধানে সংসদ সদস্য পদের অযোগ্যতা লেখা আছে, কিন্তু মন্ত্রীদের অযোগ্যতা লেখা নেই। এমনকি এ বিষয়ে রীতি-রেওয়াজ কী আছে, তা নিয়ে কারও শিরঃপীড়া নেই। মন্ত্রীদের আচরণবিধি সে কারণেই কখনো আলাপ-আলোচনায় আসে না।
গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘পেনিনসুলা আমার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ব্যবসা। বর্তমানে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং আমি সেটির চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সঙ্গে কোনো ব্যবসা করে না। মন্ত্রী হলে ব্যবসা করা যাবে না—এমন কোনো বিধানের কথা আমার জানা নেই।’ (প্রথম আলো, ৩১ অক্টোবর)।
ভারতের মন্ত্রীদের জন্য প্রণীত আচরণবিধি বলেছে, ‘মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের দুই মাসের মধ্যে তিনি আগে কোনো ব্যবসায় যুক্ত থাকলে তা পরিহার করবেন। মালিকানায় থাকবেন না। এমনকি ব্যবস্থাপনা থেকেও সরে দাঁড়াবেন। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতিতে থাকা যাবে। তাঁরা নিশ্চিত হবেন যে মন্ত্রী ওই পদে থাকলেও সরকার সে জন্য বিব্রত হবে না।’ প্রতিবছর ৩১ আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্থিক বিবৃতি জমা দেওয়াসহ ভারতের আচরণবিধিতে আরও যা আছে, তা বাংলাদেশের মন্ত্রীরা কিছুটা মেনে চললেও সরকারের জবাবদিহির চেহারাটা পাল্টে যেতে পারে। নরেন্দ্র মোদি এসে আচরণবিধিতে একটি নতুন বিধান যুক্ত করেছেন, এটি কোনো দিন আমাদের দেশে আমদানি করতে পারলে বর্তে যাব। এতে বলা হয়েছে, ‘মন্ত্রীকে অবশ্যই বেসামরিক প্রশাসনের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন কিছুই করতে আদেশ দেওয়া যাবে না, যা তাদের কর্তব্য ও দায়িত্বের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।’
চার মন্ত্রীকে সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। নোটিশপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। অন্তত একটি পথ তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেছে নিতে পারেন। আর এটা যে কারও বোধগম্য যে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার চেয়ে অনেক সহজ ও সম্মানজনক বিকল্প হলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে দাঁড়ানো। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এ দেশে সহজে কেউ নিজের জন্য অসুবিধাজনক কিছু প্রতিপালন করতে চান না। আবার চার মন্ত্রীর পক্ষে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা খুব সহজ না–ও হতে পারে। কারণ, যে কারণে তাঁদেরকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তা হয়তো কেবল চারজনের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। গত ৩১ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন প্রশ্নে চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম এসেছে। এতে বলা হয়েছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি দ্য পেনিনসুলা চিটাগাং লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন পাওয়া শাশা ডেনিমস লিমিটেডের পরিচালক পদে রয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ তালিকাভুক্ত কোম্পানি আরামিট সিমেন্ট লিমিটেড এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ও সানলাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালক পদে রয়েছেন। ভূমি প্রতিমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। কারণ, তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে এটা হলফ করে বলা হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ হবে যে সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদটি মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্নদের কিংবা অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারীর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে না।
বিষয়টিকে তাই চার মন্ত্রীর কারোরই ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া সমীচীন হবে না। আইনি নোটিশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের উচিত হবে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং একটি গঠনমূলক নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানানো। বাংলাদেশ সংবিধান আট ধরনের পদমর্যাদাসম্পন্নদের লাভজনক পদে থাকা নিষিদ্ধ করেছে। এই পদধারীরা হলেন: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী; সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার, সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য। এর মধ্যে মন্ত্রীরা ছাড়া অন্যদের সংসদের মাধ্যমে অপসারণ করা যাবে। মন্ত্রীরাই কেবল থেকে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ারে। মন্ত্রীদের ইমপিচ করার বিধান কিন্তু ব্রিটেনে রয়েছে। ইতিহাসে অনেক মন্ত্রী ইমপিচড হয়েছেনও। কিন্তু, বাংলাদেশের মন্ত্রীরা সংবিধান লঙ্ঘন করলে সে জন্য আইনে নির্দিষ্ট প্রতিকারের কথা নেই।
সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপদফা বলেছে, ‘এইরূপ কোন পদে নিযুক্ত বা কর্মরত ব্যক্তি কোন লাভজনক পদ কিংবা বেতনাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় বহাল হবেন না কিংবা মুনাফালাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোন কোম্পানী, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় বা পরিচালনায় কোনরূপ অংশগ্রহণ করবেন না।’ তবে ওই সব পদে থেকেও তো তাঁরা বেতন-ভাতা পান। সেটা নিয়ে যাতে আবার কথা না ওঠে, তাই সংবিধান এটাও স্পষ্ট বলেছে, ‘কেবল এই কারণে কোন ব্যক্তি অনুরূপ লাভজনক পদ বা বেতনাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।’
সম্ভবত এই প্রথম একটি বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এই অনুচ্ছেদটি বাস্তবে কী রূপে কার্যকর হচ্ছে, সেদিকে সবার নজর দেওয়ার। ১৪৭ অনুচ্ছেদের আওতা যথেষ্ট ব্যাপক। চার মন্ত্রীর মতো যঁারাই কোনো লাভজনক কোম্পানি বা সংস্থার পদে বহাল আছেন, তাঁরা এই যুক্তি দিয়ে পার পাবেন না যে তাঁরা নামমাত্র পদে আছেন। কোনো বেতন-ভাতা নিচ্ছেন না। সংবিধানের কথা হলো, সত্যি সত্যি বেতন–ভাতা পাওয়ার দরকার নেই। এ রকম কোনো পদের ‘মর্যাদায়’ তাঁরা বহাল হবেন না। অনেকে হয়তো ধরে রাখেন, সম্পর্ক ছিন্ন করেন না এই বিবেচনায় যে মন্ত্রিত্ব আর কতক্ষণ! কিন্তু সেটি সংবিধানের অভিপ্রায় নয়।
সরকার যদি অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর একটি অভিমতকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে এই নাগরিক উদ্যোগটি সার্থক হতে পারে। সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য একটি লিখিত আচরণবিধি প্রণয়নে সুপারিশ করেছিলেন। এ দেশে ভালো কথা বা উচিত কথা বলা এমনকি শোনার দিন যাই যাই করছে। তবু বলি, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথে কিন্তু বিএনপির মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই দায়ী নয়; ক্ষমতাসীন দল অনেক সময় নিজেও নিজের বৈরী। ১৪৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘটতে দেওয়া কিংবা সব দেখেশুনেও চোখ বুজে থাকা তেমন ধরনের একটি গুরুতর সমস্যা।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ব্রিটিশ কেবিনেট সরকারের আদলে সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পরে নাগরিক সমাজের তরফে নেওয়া এই অসাধারণ উদ্যোগটি একটি মাইলফলক ঘটনা। এটি বিড়ালের গলায় প্রথম ঘণ্টা বাঁধার প্রয়াসের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। শাহদীন মালিক এবং জেড আই খান পান্নাকে ধন্যবাদ। তাঁরা প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন সূত্রে আমাদের জাতীয় সংবিধান প্রণয়নের মাসেই ওই নোটিশ প্রদানের উদ্যোগটি নিয়েছেন। ড. কামাল হোসেনের লিখিত ভাষ্যমতে, বাহাত্তরে আমরা ব্রিটিশ কেবিনেট সরকারের কতগুলো বেসিক কনভেনশনকে সংবিধানে লিখিত রূপ দিয়েছিলাম। ১৪৭ অনুচ্ছেদ তার একটি। তবে সেটা খণ্ডিত। কারণ, ব্রিটেন মন্ত্রীদের জন্য লিখিত আচরণবিধি করেছে। সেখানে একটি ‘রেজিস্টার অব ইন্টারেস্ট’ খোলা আছে। সেখানে মন্ত্রীদের ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’বিষয়ক বিবৃতির তথ্য লেখা থাকে। কানাডার সিনেট ২০০৫ সালে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট কোড পাস করেছে। আমরা এমন কিছু ৪৩ বছর পরেও করিনি। এমনকি তা করার চিন্তাও করি না। উপরন্তু, এখন আইনি চ্যালেঞ্জকে কীভাবে দেখা হয়, সেটা একটা দুশ্চিন্তার বিষয়।
ব্রিটিশ আচরণবিধি বলছে, ‘মন্ত্রী দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নিজের, পরিবারের বা বন্ধুবান্ধবের স্বার্থে কোনোভাবেই কোনো আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা নেবেন না।’
আসুন, আমরা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবি, আমাদের মন্ত্রীরা প্রত্যেকে কেবল এই একটি বিধান নিজেদের জীবনে পালন করছেন। তাহলে তোপখানার সচিবালয়ের পরিবেশটা কেমন পাল্টে যেতে পারে?
আশির দশকের গোড়ায় অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা এন টি রমারাও। ১৯৮৭ সালে তিনি বিশ্বমিত্রা ছবিতে অভিনয়ের ঘোষণা দিলে তাঁর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রিট হয়। ১৯৮৯ সালে অন্ধ্র হাইকোর্ট তাঁর রায়ে বলেন, আচরণবিধিতে মন্ত্রীদের বাণিজ্যে জড়ানো বারণ। কিন্তু ভারতের সংবিধান বা সংবিধিবদ্ধ কোনো আইনে তা নিষিদ্ধ নয়। সুতরাং আদালতের কিছু করার নেই।
বাংলাদেশ সংবিধান তাই এখানে ভারত থেকে আলাদা।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

No comments:

Post a Comment