Monday, October 20, 2014

তিন দিন তিন যুগ তিন শ সংখ্যা

উন্মাদ–এর ৩০০ সংখ্যা বের হলো, সবাই বলল কিছু একটা করা দরকার। কী করা যায়? চিন্তাভাবনা করে ঠিক করা হলো ৩০০ সংখ্যার সব কটি প্রচ্ছদের প্রদর্শনী করা যাক। কিন্তু কথা হচ্ছে ৩০০ সংখ্যা তো নিজেদের কাছে থাকতে হবে! উন্মাদ হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেটার অফিসের টেবিলে সকালে যেটা রাখা হয়, বিকেলে সেটা আর পাওয়া যায় না। সেখানে আস্ত উন্মাদ থাকবে, তাও অ্যান্টিক সংখ্যা? তাই কি কখনো হয়?
না সম্ভব? 
লেখক সুমন্ত আসলামের একটা গুণ হচ্ছে সে অসম্ভব গোছানো একজন তরুণ, কি লেখালেখিতে কি ব্যক্তিজীবনে। সেই সুমন্ত আসলাম আমার অফিসে এসে একদিন খুবই করুণ গলায় বলল, ‘স্যার, আমাকে একটা দিন সময় দিন, আমি আপনার অফিসটা গুছিয়ে দিই।’

কাজেই সেই অফিসে পুরোনো উন্মাদ বা তার প্রচ্ছদ পাওয়া যাবে? তাই কি কখনো হয়? না সম্ভব? কাজেই খোঁজ লাগানো হলো চারদিকে। কার কাছে কোন সংখ্যা আছে। সংখ্যা হতে হবে পুরোনো এবং ৩০০ নয়, বাছাই করা ১০০ সংখ্যার প্রদর্শনী হলেই হবে। দু–একজন অতি উত্সাহী স্পনসরের জন্য উতলা হয়ে উঠল (বলাই বাহুল্য, তারা নাকি এখনো স্পনসরের জন্য ছুটছে, তবে আমাদের অনুষ্ঠান কিন্তু শেষ! এখানে বলে নেওয়া ভালো ‘উন্মাদ’ নামের কারণে আমাদের আসলে কেউ স্পনসর করতে চায় না! হা হা হা!)
সে যা–ই হোক, কারও কাছে বাল্ক উন্মাদ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের মতিঝিলের গোডাউনে নতুন উন্মাদ আছে, কিন্তু আমাদের দরকার পুরোনোগুলো। শেষ পর্যন্ত একজনকে পাওয়া গেল—নাম কামরুল। সে যে বহু আগে থেকে উন্মাদ পড়ে তা নয়, বছর কয়েক ধরে সে উন্মাদ পড়ছে এবং সে সম্প্রতি একটা মিশন নিয়ে নেমেছে (মিশন ইম্পসিবলও যেন এর কাছে তুচ্ছ)। তিন মাসের মধ্যে সব উন্মাদ তার লাগবে এবং একবারে সব উন্মাদ পড়ে সে হেসে ফেলতে চায়। কারণ, সে সদ্য–পাস–করা একজন ইঞ্জিনিয়ার। সব উন্মাদ পড়ে হেসে ফেলার পর সে তার ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করবে। অর্থাৎ, সে ৩০০ উন্মাদ কালেক্ট করবেই করবে! বাই হুক অর ক্যাপ্টেন জেমস কুক।
প্রথমে সে আমাদের মতিঝিলের কমার্শিয়াল অফিসে গিয়ে ব্যর্থ হলো, সেখানে সব পেল না। তারপর মিরপুরের এডিটরিয়াল অফিসে এসে হাজির। আমিও তাকে খুব একটা হেল্প করতে পারলাম না। তখন তার যেন তালুতে বায়ু চড়ে গেল। নীলক্ষেত–টাইপের ঢাকার যত পুরোনো বইপত্রের দোকান আছে, সেগুলো লাঙল দিয়ে চষে ফেলতে লাগল। এবং একসময় সত্যি সত্যি সে ১৫টা কম ৩০০ সংখ্যা জোগাড় করে ফেলল, তিন মাসের মধ্যে! আমি খুব আশ্চর্য হলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কীভাবে এতগুলা উন্মাদ এত কম সময়ে সংগ্রহ করলে?’ তখন সে যে ব্যাখ্যা দিল, তাতে আমি ‘হতস্তম্ভিতমূঢ়’ (হতভম্ব+স্তম্ভিত+বিমূঢ়)! উন্মাদ নিয়ে ভাবতে ভাবতে (বা খুঁজতে খুঁজতে) তার নাকি এমন অবস্থা হয়েছে যে মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠত এবং দুঃস্বপ্নের পর যে স্বপ্ন দেখত ভোররাতে, সেখানে কে একজন তাকে বলছে, ‘ওহে কামরুল, অমুক জায়গায় উন্মাদ–এর অমুক সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে ...!’ তখন সে ঘুম থেকে উঠে ছুটে গিয়ে সেই জায়গায় হাজির হতো এবং সত্যি সত্যি সেই ‘স্বপ্নপ্রাপ্ত’ উন্মাদ পেয়ে যেত!
যাহোক, সেই স্বপ্ন–বালকের কাছ থেকেই শেষ পর্যন্ত পছন্দমতো উন্মাদ সংগ্রহ করা হলো, মানে প্রচ্ছদ সংগ্রহ করা হলো। ফ্রেমিং হলো। প্রদর্শনীও শুরু হয়ে গেল (স্পনসর কিন্তু তখনো খোঁজা হচ্ছে)। না, কোনো প্রধান অতিথি বা উদ্বোধনের জন্য বিশেষ কেউ ছিলেন না। আমাদের তরুণ কার্টুনিস্টরা মিলেই উদ্বোধন করে ফেলল। তিন দিনের প্রদর্শনীর প্রথম দিনে ৩০০ সংখ্যার কেক কাটা হলো। খাওয়াদাওয়া হলো। দর্শক আসতে শুরু করেছে, খাওয়াদাওয়া সবার জন্য উন্মুক্ত, শুধু বাথরুম নিজ দায়িত্বে।
সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে প্রচ্ছদ প্রদর্শনী উপভোগ করল বলেই মনে হলো। সব কটি প্রচ্ছদের ফ্রেমের নিচে আবার মন্তব্যও আছে। কিছু মন্তব্যের নমুনা দেওয়া যাক—
‘উন্মাদ ক্রমে ক্রমেই ব্যবসায়ী হয়ে উঠছে। প্রচ্ছদে বিজ্ঞাপন নেওয়া শুরু! অথচ একসময় উন্মাদ–এ লেখা থাকত “দেশের একমাত্র বিজ্ঞাপনবিহীন পত্রিকা” (সেলুকাস কী বিচিত্র এই পত্রিকাজগৎ!)। প্রচ্ছদশিল্পী পলাশ। উন্মাদ ত্যাগ করে এখন গ্রেতে কর্মরত।’
‘উন্মাদ–এর সবচেয়ে বাজে প্রচ্ছদ! তবে তখন উন্মাদ–এর সার্কুলেশন ৩০ হাজার! বাজে প্রচ্ছদ বলেই প্রচ্ছদশিল্পী এখন গা ঢাকা দিয়েছেন, মানে দ্য ফিউজিটিভ! (উন্মাদ যতই বিক্রি হোক তাঁর কী?)’
‘প্রচারবিমুখ এই শিল্পী, মানে এই উন্মাদ–এর প্রচ্ছদের শিল্পী বর্তমানে ব্যাপক প্রচার–উন্মুখ হলেও তাঁর নামের সঠিক বানান না জানায় দেওয়া গেল না...সরি!’
‘৩৬ বছরের উন্মাদ–এর প্রথম দিককার একটি অ্যান্টিক প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদশিল্পীর নামও অ্যান্টিক, মানে কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে! তবে নাম উদ্ধারের চেষ্টা চলছে!’
‘উন্মাদ–এর প্রচ্ছদ অঙ্কনে ফাঁকিবাজির চরম উত্কর্ষের প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই প্রচ্ছদ। এর জন্য যাকে দায়ী করা যেত...সে এখন চরম হাইবারনেশনে!’
...ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রচ্ছদ দেখে না হাসলেও প্রচ্ছদের নিচে সাঁটানো লেখাগুলো পড়ে অনেকে মজা পেয়েছে, কিঞ্চিৎ হাসতেও দেখা গেছে। এটাই–বা কম কী?
উন্মাদ থেকে কার্টুন প্রদর্শনী অনেক হয়েছে। প্রচ্ছদ প্রদর্শনী এই প্রথম (যদিও সেটাও কার্টুন)। স্পনসর ছাড়াই গ্রেট সাকসেস! প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে মিউজিক ডে! আমাদের নিজস্ব গায়ক মাহমুদ তো আছেই। তা ছাড়া গাইলেন শাহেদ (আমার বন্ধু মানুষ) কার্টুনিস্ট মিনার (সে গায়কও বটে)। গানের ফাঁকে ফাঁকে বেলুন ফাটছিল। কারণ, গ্যালারিভরা বেলুন। ফ্যানের বাড়ি খেয়ে, দর্শকদের পদদলিত হয়ে বেলুন ফাটছিলই। কার্টুনে ‘ডায়লগ বেলুন’ একটি জরুরি অনুষঙ্গ বলেই যেন এই প্রদর্শনীতে বেলুনের ছড়াছড়ি! জাতীয় পর্যায়ে আমরা ফাঁপা কথা বেশি বলি, তারই প্রতীকী এই ফাঁপা বেলুন? যেন না চাইতেই গ্যালারিতে স্বতঃস্ফূর্ত ‘থ্রিডি কার্টুন’ শো! তবে আমাদের মিউজিক ডেতে গান কিন্তু একটাই হিট—‘শ্রাবণের মেঘগুলো...’! এই গান যেন উন্মাদ–এর দলীয় সংগীত। যে ব্যান্ডের এই গান, তারাও বোধ হয় এতবার গায়নি, আমাদের প্রদর্শনীগুলোয় যতবার গাওয়া হয়েছে। তবে মিউজিক ডেতে শেষ আকর্ষণ গায়ক শাহেদের ‘রোখসানা...’, তাঁর সেই বিখ্যাত গান।
শেষ দিনেও নিয়মিত প্রদর্শনী চলেছে। একফাঁকে পদক দেওয়া হলো, একটা–দুটা পদক নয়, দশ–দশটা পদক! সেরা ‘কার্টুনিস্ট পদক’, সেরা ‘আইডিয়ানিস্ট পদক’ তো আছেই, তা ছাড়াও আছে উন্মাদ–এর নিজস্ব কিছু ‘ফান পদক’। তার অফিশিয়াল গুরুত্বও কিন্তু কম নয়। অবশেষে একসময় প্রচ্ছদ প্রদর্শনীর সব আয়োজন শেষ হলো। তিনটা দিন তিন যুগ তিন শ সংখ্যা...সব মিলিয়ে আনন্দ কম হলো না, এবার ফিরে যাওয়ার পালা। যে যার ডেরায় ফিরে যাচ্ছে। আমিও ফিরছি। ফিরতে ফিরতে মনে হলো সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে তিন যুগ ধরে ৩০০ সংখ্যা বের করলাম সত্যি, কিন্তু সত্যিই কি উন্মাদ–এর পাঠকদের কিছু দিতে পেরেছি আমরা? পাঠক কি উন্মাদ পড়ে সত্যিই কখনো হেসেছে? এর উত্তর আমার অন্তত জানা নেই। বরং নিকোলাস ম্যাকিয়াভেলির একটা বাণীর মধ্যে এর উত্তর খোঁজা যেতে পারে: ‘হাসতে হাসতে যেদিন আমি কাঁদতে শুরু করব, সেদিন অন্তত আমাকে হাসির কারণগুলো আরেকবার বোলো!’

No comments:

Post a Comment