সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলার সাংগঠনিক শক্তি ও প্রস্তুতি কোনোটাই এ মুহূর্তে নেই বিএনপির। তার পরও মূলত তারেক রহমানের পরিকল্পনায় ঈদুল ফিতরের পর বিএনপি আন্দোলনে নামছে বলে দলীয় দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লন্ডন-প্রবাসী তারেক রহমান সাম্প্রতিক কালে দলীয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, তারেক রহমান মনে করেন, আন্দোলনে না গেলে বিএনপির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। আন্দোলন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি বা পুনর্গঠন একসঙ্গে চালাতে হবে।
এসব নেতা জানান, এখনই সরকারকে চাপে ফেলার মতো আন্দোলন খুব শিগগির গড়ে তোলা সম্ভব হবে না, এমনটা ধরে নিয়েই এই ঈদের পর থেকে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত প্রায় দেড় মাসব্যাপী কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ সরকারকে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এসব কর্মসূচি পালন করা হবে। যার বেশির ভাগই ‘জনসম্পৃক্ততামূলক’ ও ‘শান্তিপূর্ণ’। সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে এমন কর্মসূচি এড়িয়ে যাওয়ার চিন্তা রয়েছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৬ জুলাই ঢাকা মহানগর বিএনপির ইফতার মাহফিলে বলেছেন, ঈদের পর তাঁদের এ আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ। এতে বাধা দেওয়া হলে প্রতিরোধ করা হবে। পরদিন ১৭ জুলাই তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবে এক ইফতার অনুষ্ঠানে বলেছেন, তাঁরা যুদ্ধ ঘোষণা করছেন না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে চান।
খালেদা জিয়া আজ শনিবার সৌদি আরবে যাচ্ছেন। তারেক রহমানও লন্ডন থেকে সৌদি আরবে আসবেন পরদিন। সেখানে মা ও ছেলের মধ্যে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে বলে বিএনপির নেতারা মনে করছেন।
এদিকে আন্দোলন সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক করে ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি অনুমোদন করেছেন খালেদা জিয়া। গতকাল তা ঘোষণা করা হয়। এতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুকে। আর সদস্যসচিব করা হয়েছে হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে।
খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ একজন নেতা জানান, ঈদের পরে আন্দোলনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের কোনো বৈঠক হয়নি।
আন্দোলনের ছক কী হবে, তা ঠিক করার ক্ষেত্রে মূলত তারেক রহমানের পরামর্শকে প্রাধান্য দিচ্ছেন খালেদা জিয়া। ফলে বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা এ বিষয়ে পরিষ্কার কিছু জানেন না। কর্মসূচি পালনের কর্মকৌশল নির্ধারণে তারেক রহমানের বিশ্বস্ত নেতাদের বেশি কাজে লাগানো হবে।খালেদা জিয়া সম্প্রতি তাঁর বিশ্বস্ত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এমন কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন।
ওই নেতা আরও জানান, এখন থেকেই কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার পক্ষে তারেক রহমান তাঁর যুক্তি মায়ের কাছে তুলে ধরেছেন। তারেকের মতে, আন্দোলনে থাকলে নেতা-কর্মীরা দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। নয়তো দল ও জোটের শরিকেরা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে চলার চেষ্টা করবে। আর মাঠ ছেড়ে দিলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সংগঠন ভেঙে পড়বে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ঈদুল ফিতরের পর প্রথম ধাপের কর্মসূচির মধ্যে দেশব্যাপী গণসংযোগ, সমাবেশ, খালেদা জিয়ার বিভিন্ন জেলা সফর এবং ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার চিন্তা আছে। এ ধাপের কর্মসূচির শেষ দিকে এসে ঢাকায় মহাসমাবেশ করে খালেদা জিয়া পরবর্তী কর্মসূচি বা করণীয় ঘোষণা করবেন। তবে এ ধাপে হরতাল দেওয়ার ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। এ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতভিন্নতাও আছে। তাই এ ধাপে হরতাল দেওয়ার চিন্তা আপাতত নেই। এটা উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা জানান, ঈদের পরের কর্মসূচিকে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনা বলা যেতে পারে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরকার গঠনের পর ১৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন জোট আন্দোলন থেকে সরে আসে। বিএনপি ভেবেছিল, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আবার নির্বাচন দেবে, কিন্তু তা না হওয়ায় আন্দোলনে যেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, সরকার নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের কথা বলেছিল। কিন্তু এখন তারা নতুন নির্বাচনের পক্ষে নয়। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিএনপিকে আন্দোলনে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আন্দোলনে কী ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। দলে ও জোটে আলোচনা করে ঠিক করা হবে।
No comments:
Post a Comment