‘নন্দ বাড়ির হত’না বাহির/কোথা কি ঘটে কি জানি/ চড়িত না গাড়ি, কি জানি কখন উল্টায় যদি/নৌকা ফি-সন ডুবিছে ভীষণ, রেলে কলিসন হয়/ হাঁটিতে সর্প, কুকুর আর গাড়ি চাপা পড়া ভয়’
নন্দলালের মতো মানুষ থাকায় এই কিছুদিন আগেও বাঙালিকে বলা হতো ‘ঘরকুনো’। আর এখন, যুগের হাওয়া বদলেছে। তাই বদলে গেছে উত্সব-পার্বণের ধরন-ধারণ। সে জন্যই তো বাঙালিরা ঘরের কোনে চুপটি করে বসে থাকেন না। উত্সবের সময় এলেই এখন তাঁরা আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠেন। ইচ্ছা একটাই, ছুটির ফাঁকে ‘ঘর হতে’ দুই পা ফেলা। বিত্তবানেরা পাড়ি দেন বিদেশ-বিভুঁইয়ে। আর মধ্যবিত্তরা বেছে নেন রূপসী বাংলারই আনাচকানাচ। চলে যাওয়া বছরগুলোর ঈদের ছুটিতে বাঙালিরা ঘুরেছেন ইচ্ছেমতো। এবারও সেই একই প্রস্তুতি। তাতেই বোঝা যায় নন্দলালেরা পাল্টে গেছেন।
ঈদের আগের ব্যস্ততা সেরে কেউ বেরোবেন সপরিবারে, কেউবা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। কেউ যাচ্ছেন নিজের মতো করে। কেউবা সাহায্য নিচ্ছেন ট্যুর অপারেটদের দিকে। তাই মহাব্যস্ত হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট পরিচালনাকারীরাও।
জানা গেছে, এবার ঈদের সময় একটা বড় অংশের মানুষ যাচ্ছেন কক্সবাজার। কেউ কেউ সিলেট-শ্রীমঙ্গলও বেছে নিচ্ছেন।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম শিকদার বললেন, তাঁরা আশা করছেন ঈদের ছুটিতে এবার কক্সবাজারে দেড় লাখের মতো পর্যটকের সমাগম হবে। তাঁর ভাষায়, কক্সবাজার ঈদের সময় বিশ্ববাসীর নানাবাড়ি।
তবে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি তৌফিক উদ্দিন আহম্মদ প্রথম আলোকেবলেছেন, কক্সবাজারে এবার শেষ পর্যন্ত ঠিক কত পর্যটক যাবেন, তা নির্ভর করছে মহাসড়কের অবস্থার ওপর। ঢাকা থেকে সড়কপথে কক্সবাজার যেতে এখন সময় লাগছে ২০ ঘণ্টার মতো। তাঁর আশঙ্কা, অনেকেই এই কষ্টের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন।
তবে ঈদের সময় কত মানুষ বেড়াতে যাবেন, সেই তথ্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছে বিদেশি পর্যটকদের বছরওয়ারি তথ্য আছে। কিন্তু দেশি পর্যটকদের সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন এ ব্যাপারে কিছু জানে না।
কেন বেড়ানো: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতিমা মুহাম্মদ। পরিবারের ১৫ সদস্যের সঙ্গে তিনিও ঈদের ছুটিতে যাচ্ছেন কক্সবাজার। তিনি বলেন, ‘বছরজুড়েই আমাদের কারও না কারও পরীক্ষা থাকে। সবার একসঙ্গে হওয়াটাই মুশকিল। ঈদের ছুটির সময় কারও কোনো বড় পরীক্ষা নেই। তাই এ সুযোগটা এবার হাতছাড়া করিনি আমরা। সব প্রস্তুতি শেষ। এখন শুধু দিন গুনছি।’
বিজ্ঞাপনী সংস্থা জানালা বাংলাদেশের গ্রাফিকস শিল্পী কাজী হাসান ফাত্তাহও প্রতিবছরই ঈদে বেড়াতে যান। পৈতৃক ভিটা যশোরে। এক ঈদ করেন যশোরে, অন্য ঈদে বেড়াতে যান। সঙ্গে যান বন্ধু-বান্ধব-সহকর্মীরা। গত বছর ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলেন দার্জিলিং। তার আগের বছর বান্দরবান।
ঈদে বাইরে বেরিয়ে পড়ার এই প্রবণতার কারণটা কী? এর ব্যাখ্যায় অনেকে বলছেন, শহুরে আবহাওয়া, বছরজুড়ে কাজের চাপ, ছোট পরিবার, ক্রয়ক্ষমতা বাড়া ইত্যাদি। তবে এটা ঠিক একটু অন্য রকম স্বাদ পেতে মানুষ বাইরে যান, যাতে ফিরে এসে পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মুজিব আহমেদ মনে করেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়া এই প্রবণতার অন্যতম কারণ। এই ইতিবাচক প্রবণতাটা যেন ভ্রমণপিপাসুরা ধরে রাখতে পারেন, সে জন্য বিশেষ উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। নইলে বেড়ানোর জন্য তুলে রাখা টাকা অন্য অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হবে। তখন হয়তো একটি পোশাকের দরকার হলে কেনা হবে তিনটি।
আর কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলছেন, নারীদের শিক্ষার হার বাড়ায় পর্যটনে আগ্রহ বাড়ছে মানুষের। শিক্ষিত নারীদের ছোট পরিবার। তাঁরা বেড়ানোর জায়গা-উপযোগিতা সম্পর্কে জানেন। মূলত তাঁরাই উদ্যোগী হয়ে বেরিয়ে পড়ছেন।
পর্যটকদের জন্য কতটা প্রস্তুত পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো: শ্রীমঙ্গলের নিসর্গ ইকোরিসোর্টের পরিচালক কাজী আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষাকালটা ঠিক বেড়ানোর মৌসুম না। কিন্তু রোজার শুরুতেই তাঁর সব কটেজ ভাড়া হয়ে গেছে। পাচক ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন বলে নতুন পাচক নিতে হয়েছে। তিনি এখন ভীষণ ব্যস্ত।
কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির উদ্যোগে শিল্পীদের আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কক্সবাজারেও হয়েছে শতাধিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট। নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ছয় হাজার স্টুডিও ফ্ল্যাট। এসব ফ্ল্যাটে পারিবারিক আবহে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
কক্সবাজারের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে উঠেছে বিরাট বাধা। এখানকার উদ্যোক্তারা বলছেন, দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথটাকে দোহাজারী পর্যন্ত টেনে দিলে লোকের কষ্ট কমে। পর্যটকের সংখ্যাও বাড়ে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজারে আনার ব্যবস্থা এ শিল্পের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁরাই করতে চান। কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
টোয়াব বলছে, আকাশপথে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারে যাওয়া লোকের সংখ্যা নেহাতই কম। দেশি পর্যটকের কথা বিবেচনা করে যোগাযোগব্যবস্থাটা ভালো করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মুজিব আহমেদ বলেন, ‘পর্যটন বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের ধারণার সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা সব সময় বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কথা ভাবি। কিন্তু দেশি পর্যটকেরা যেখানে প্রচুর সংখ্যায় যান, সেখানেই পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটে। কাজেই দেশি পর্যটকদের কথা মাথায় রাখতেই হবে।’
No comments:
Post a Comment