সতেরো বছর বয়সে খুকু রানী বউ হয়ে আসেন মদনপুরা গ্রামের পালপাড়ায়। তাঁর বাবার বাড়ির কেউই মাটির কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার এই গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে এসে স্বামীর হাতের তৈরি মৃৎসামগ্রী দেখে তাঁরও প্রবল আগ্রহ হয় কাজটি শেখার। সেই আগ্রহ থেকে কুমার পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। স্বামীর সাহচর্য, নিজের একাগ্রতা আর শিল্পবোধের মিশেল ঘটিয়ে বাউফলের মৃতপ্রায় মৃৎশিল্পে ঘটালেন সম্ভাবনাময় বিবর্তন। নতুন করে জাগিয়ে তোলেন এখানকার মৃৎশিল্পীদের।
চার দশক আগের কথা। মাটির পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কুমারদের অনেকেই ছেড়ে দিচ্ছিলেন এই পুরুষানুক্রমিক পেশা। এ রকম প্রতিকূলতার মধ্যে এখানকার কয়েকজন মৃৎশিল্পী তাঁদের এই ঐতিহ্যকে বাণিজ্যিকভাবে বিকাশের জন্য উদ্যোগী হন। এঁদের একজন খুকু রানীর স্বামী রাজেন্দ্র পাল। শৈল্পিক চিন্তাচেতনা দিয়ে হরেক রকম মৃৎসামগ্রী তৈরি শুরু করেন। খুকু রানী স্বামীর সঙ্গী হন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় শৌখিন মৃৎসামগ্রীতে আসে নান্দনিকতার ছোঁয়া।
খুকু রানীর বয়স ৭০ পেরিয়েছে। ২০০৯ সালে স্বামী রাজেন্দ্র পালের মৃত্যুর পর থেকে খুকু তাঁদের এ পেশাটি ধরে রেখেছেন। তাঁর তৈরি সামগ্রী এখন বিদেশেও যাচ্ছে।
খুকু রানীর দেখাদেখি গ্রামের অন্তত ৬০টি পরিবার এখন শৌখিন মৃৎসামগ্রী তৈরি করে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছে।
পেছনের কথা: বাউফলের মদনপুরা ইউনিয়নের মদনপুরা গ্রামে রুদ্র পাল সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস। ষাটের দশকে তারা চাকা ঘুরিয়ে মাটির কাপ-পিরিচ, ফুলদানি, অ্যাশট্রে, প্লেট, গ্লাসসহ নানা ধরনের শৌখিন মৃৎসামগ্রী তৈরি শুরু করেন। ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে পটুয়াখালীতে কৃষি প্রদর্শনীতে রাজেশ্বর পাল তাঁদের তৈরি মৃৎসামগ্রী নিয়ে হাজির হন। প্রদর্শনীতে মৃৎসামগ্রীর প্রশংসা পেলেও বাজারজাত করার সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।
পরে স্ত্রী খুকু রানীর পরামর্শে ১৯৭৭ সালে রাজেশ্বর পাল নানা ধরনের বাহারি নকশার তৈরি শৌখিন মৃৎসামগ্রী নিয়ে বরিশাল শহরে এসে টাউন হলের সামনে ফুটপাতে সাজিয়ে হাতে কেটে বিক্রি শুরু করেন। তাঁদের শৌখিন মৃৎসামগ্রী অনেকেই আগ্রহভরে কিনে নেয়।
১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাউফলের মৃৎসামগ্রী শিল্পের সম্ভাবনা ও সমস্যার নানা দিক তুলে ধরে জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পায় বাউফলের মৃৎশিল্প।এমনকি তাঁদের এলাকার নামেও পরিবর্তন আসে। পরিচিতি পায় ‘পালপাড়া’ হিসেবে।
পত্রিকায় প্রতিবেদন দেখে বিসিকের পক্ষ থেকে মৃৎসামগ্রীকে আরও সৌন্দর্যের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলার জন্য শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৮০ সালের ১০ অক্টোবর বাউফলের তিন নারীসহ ১৬ জন কারিগরকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মৃৎসামগ্রীর আধুনিকতা, সৌন্দর্য বর্ধন, নকশা, মাটি প্রক্রিয়াসহ নানা বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তৎকালীন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক আবদুস শাকুর বাউফলের পালপাড়া এসে একটি শিল্প কারখানার জন্য ঘর তৈরি করে সেখানে দুটি টেবিল হুইলের (টেবিলের ওপর হাতে চাকা ঘোরানো) ব্যবস্থা করে দেন। এরপর তাঁদের শৌখিন মৃৎসামগ্রীতে আসে নতুনত্বের ছোঁয়া।
বাজারজাত: বিসিকের সহায়তায় ১৯৮১ সালে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত বৈশাখী মেলায়ও বাউফলের মৃৎসামগ্রী মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। রাজেশ্বর পালের ছোট ভাই বিশ্বেশ্বর পাল জানান, বরিশাল টাউন হলের সামনে ফুটপাতে মৃৎসামগ্রী বিক্রির সময় হঠাৎ একদিন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্র পরিচয় দিয়ে শাহজাহান মিয়া নামের এক যুবক কিছু নতুন ডিজাউন দিয়ে অল্প কিছু সামগ্রীর অর্ডার দিয়ে বলেন, ঢাকাতে তাঁর পরিচিত দোকানে এই সামগ্রীগুলো সাজিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করবেন। এরপরই নতুন উদ্যমে শুরু হয় সরবরাহ করা নকশা অনুযায়ী সামগ্রী তৈরি। ওই নকশার সৌন্দর্যের ছোঁয়ায় তাঁদের শৌখিন মৃৎসামগ্রী নান্দনিকতায় ফুটে ওঠে।
১৯৮২ সালে ঢাকা থেকে আড়ং তাঁদের শৌখিন মৃৎসামগ্রী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ঢাকার কারিতাসের কোরার্দিজুট ওয়ার্কস নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। এভাবে চলতে থাকে তাঁদের ব্যবসা। ১৯৮৬ সালে আড়ংয়ের ডিজাইনার চন্দ্র শেখর সাহা এবং কোরার্দিজুট ওয়ার্কসের ডিজাইনার সুকুমার পালের দেওয়া নকশা অনুযায়ী তাঁরা মৃৎসামগ্রী তৈরি করে সরবরাহ করতে থাকেন।
বর্তমানে তাঁরা প্রচলিত সামগ্রীর পরিবর্তে কাপ, প্লেট, টি-পট, ফুলদানিসহ কারুকার্য ও নকশা আঁকা শৌখিন সামগ্রী তৈরি করছেন। এ ছাড়া মাটির ঘণ্টা, ফুটস্ক্রাফট, কলমদানি, আগরদানি, মোমদানি, শিশুদের খেলনা প্রভৃতি নজরকাড়া নকশার সামগ্রীর বিপুল চাহিদা রয়েছে দেশ ও দেশের বাইরে। ঢাকার আড়ংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য আমেরিকা, ফ্রান্স, কানাডা, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান বিশ্বেশ্বর পাল।
বর্তমান অবস্থা: খুকু রানী বর্তমানে স্বামীর এ পেশাটি ধরে রেখেছেন। আর বাজারজাতের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁর ছেলে বরুণ পাল। খুকু রানী জানালেন, তাঁদের পালপাড়ায় ৬০টি পরিবার বর্তমানে শৌখিন মৃৎসামগ্রী তৈরি করছে। আর কারিগর আছেন নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৩০০ জন। হিন্দুদের পাশাপাশি অনেক মুসলিম পরিবারও এই মৃৎসামগ্রী তৈরিতে যুক্ত রয়েছে। খুকু রানীর কারখানায় কারিগর আছেন ১২ নারীসহ মোট ২৭ জন। বৈদ্যুতিক মোটরচালিত চাকা ঘুরিয়ে সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। কারিগর জলিল মৃধা জানালেন, ১০ বছর ধরে তিনি এ কাজে যুক্ত। উৎপাদনের ভিত্তিতে মজুরি পাচ্ছেন প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা ।
সমস্যা: বাউফলের শৌখিন মৃৎসামগ্রীর ব্যাপক সম্ভাবনার পাশাপাশি সমস্যাও রয়েছে অনেক। খুকু রানীর ছেলে বরুণ পাল জানান, বাউফল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার সামগ্রী লঞ্চ অথবা ট্রাকে করে ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে মাটি সংগ্রহ-প্রসেসিং, কাঠ, কারিগরদের মজুরি, রং, পোড়ানো, পরিবহনসহ প্রতিটি খাতেই আগের তুলনায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে সরকারিভাবে বাউফলে পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন করলেও সেটি অকেজো পড়ে আছে। কাঠ দিয়ে পোড়ানোর ফলে বেড়ে যাচ্ছে খরচ। পাশাপাশি পুঁজির অভাব তো রয়েছেই।
শেষ কথা: সারা দেশে পর্যটন এলাকাগুলোতে স্টল বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন খুকু রানী। একই সঙ্গে উন্নত প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণদান, বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন ও সরাসরি বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে সরকারের নজর জরুরি বলে মত দেন তিনি। সেটা করা গেলে বাউফলের মৃৎশিল্প একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাতে পরিণত হবে।

No comments:
Post a Comment