Thursday, July 24, 2014

ট্রাফিক কাউন্টডাউন টাইমারের ১৫ কোটি টাকাও জলে!

২১ জুলাই। বিকেল চারটা। রাজধানীর পল্টন মোড়। সিগন্যাল বাতিও জ্বলছে, ‘কাউন্টডাউন টাইমার’ মেশিনেও সময় উঠছে। কিন্তু কোনো যানবাহনকে সিগন্যাল বাতি কিংবা টাইমারের সময় মানতে দেখা যায়নি। যান নিয়ন্ত্রণ করছে ট্রাফিক পুলিশ।
কেন কাউন্টডাউন মেশিন অনুযায়ী যান নিয়ন্ত্রণ করছেন না—জানতে চাইলে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কোনো প্রশিক্ষণ নাই। তা ছাড়া ঢাকা শহরের যানবাহনের চাপের বাস্তবতার কারণে এটা মানাও সম্ভব না।’
খোঁজ নিয়ে তথ্য মিলেছে, যানজট কমানোর জন্য এ বছরের মার্চ মাসনাগাদ ঢাকার ৬৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল ইন্টারসেকশনে ‘কাউন্টডাউন টাইমার’ যন্ত্র বসানো হয়। এতে ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণ (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের (ডিএনসিসি) ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর আগে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক বিভাগ ও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়হীনতার কারণে যানটজ নিরসনে এসব প্রকল্প কাজে আসেনি। সব টাকা গেছে জলে। যান নিয়ন্ত্রণ হয় সনাতন পদ্ধতিতে।
চলতি বছরের মার্চ মাসেই লাগানো হয়েছে টাইমার কাউন্টডাউন মেশিন। অথচ এখন বিকল। রাজধানীর ফার্মগেটের আরেক পয়েন্ট থেকে ছবিটি  তোলা। ছবি: মনিরুল আলম।

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পিক-আওয়ারে সকাল আটটা থেকে বেলা ১১টা এবং বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দুই মিনিট পরপর সিগন্যাল পড়বে। অফপিক আওয়ারে ভোর ছয়টা থেকে সকাল আটটা, বেলা ১১টা থেকে বিকেল চারটা এবং রাত আটটা থেকে ১০টা পর্যন্ত আড়াই মিনিট পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল পড়বে। এ পদ্ধতি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হলে রাজধানীতে যানজট কমবে।
যান চলে হাতের ইশারায়। টাইমার কাউন্টডাউন মানে না কেউ। ছবি: মনিরুল আলম

তবে রাজধানীর হাইকোর্ট ও কদমফোয়ারা মোড়, পল্টন মোড়, জিরো পয়েন্টসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি ট্রাফিক পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, পুলিশ টাইমার যন্ত্র অনুসরণ করছে না। তারা হাত দিয়েই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। টাইমার যন্ত্রও অনুসরণ করছে না ট্রাফিক পুলিশ। তারা এখনো বাঁশি, লাঠি, রশি ও হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতির মতো এ যন্ত্রটিও যানজট নিরসনে রাখছে না কোনো ভূমিকা।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫টি সিগন্যালে টাইমার বসানো হয়েছে। টাইমার পরিপূর্ণভাবে কাজ করার জন্য শক্তি জোগাতে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুত্ চালিত সোলার প্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে যেকোনো সময় সোলার প্যানেলের জমাকৃত চার্জ ফুরিয়ে গেলে ট্রাফিক সিগন্যালের টাইমিং ব্যবস্থা যেন মুহূর্তের জন্যও থমকে না যায় এ জন্য এতে বিদ্যুত্-সংযোগও দেওয়া হচ্ছে।ডিএসসিসির ট্রাফিক বিভাগের একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথমআলোকে বলেন, ‘টাইমার কাউন্টডাউন প্রকল্প যানজট নিরসনের জন্য নয়, কমিশন খাওয়ার জন্য বসানো হয়েছে; যা কোনো কাজেই আসবে না। কারণ এই শহরে গাড়ির চাপ বেশি। লোকজন ট্রাফিক পুলিশই মানে না, আর টাইমার!’কাউন্টডাউন টাইমার প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ শিহাব উল্লাহ প্রথম আলোকেবলেন, ‘যানজট নিরসনে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। এটা নিরসনের জন্য এ ধরনের সিঙ্গেল প্রজেক্ট সহায়ক হতে পারে না।’ 
টাইমার সম্পর্কে জানে না ট্রাফিক পুলিশ!
যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন এবং কীভাবে টাইমার কাউন্টডাউন যন্ত্র বসানো হয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই জানে না ঢাকা মেট্রোপলিটনের ট্রাফিক পুলিশ। ফলে কাউন্টডাউনের নিয়মে তারা যান নিয়ন্ত্রণ করছে না।ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, কোনো স্টাডি ছাড়া কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ওই সব সিগন্যাল মেনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ ওই টাইমার ঘড়িতে প্রতিটি সড়কমুখে সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সকালে সচিবালয়মুখী গাড়ি বেশি থাকে। আর দুপুরে হয় তার উল্টো । তাই একেক সময় টাইম কাউন্টডাউনের তারতম্য দরকার; যেটা মাঠে কাজ করা ট্রাফিক পুলিশই ভালো জানে।এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মিলি বিশ্বাস বলেন, ‘টাইমার যন্ত্র ও সোলার প্যানেল কারা বসিয়েছে, কীভাবে বসিয়েছে এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

No comments:

Post a Comment