Friday, July 25, 2014

‘এক দিন গাড়ি চালালে তিন দিন বন্ধ রাখতে হয়’


চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সড়ক। ভিআইপি সড়ক নামেও পরিচিত। কিন্তু সড়কটির বর্তমান বেহাল অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি ভিআইপিদের চলার পথ। যেন মরণফাঁদ।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কটির করুণ চিত্র নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। সেই থেকে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও সড়কটি পূর্ণাঙ্গভাবে সংস্কার করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। বৃষ্টি ও নিয়মিত সংস্কারের অভাবে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কটি।
গত বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের পতেঙ্গা কোস্টগার্ড স্টেশন থেকে ১৪ নম্বর ডিপো পর্যন্ত দুই কিলোমিটার অংশে কোনো কার্পেটিং নেই। খানাখন্দে ভরা ড্রাইডক থেকে কোস্টগার্ড স্টেশন পর্যন্ত এক কিলোমিটার এলাকা। যানবাহন চলছে থেমে থেমে, গর্তের ভেতর পড়ে হেলেদুলে। কখনো গর্তে পড়ে গাড়ি আটকে যাচ্ছে। যাত্রীরা নেমে সেই গাড়ি ঠেলে তুলছেন। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে জলাশয়ে রূপ নিয়েছে সড়কটি।
দেখা যায়, খানাখন্দের কারণে ২৪ ফুট প্রশস্ত এই সড়কের এক পাশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না, আরেক পাশ দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে সতর্কতার সঙ্গে। সিটি করপোরেশনের লোকজন সড়কের বায়তুল আমান জামে মসজিদের সামনের অংশে ইটের খোয়া ও বালু দিয়ে কোনোরকমে ভরাট করে দিচ্ছেন গর্তগুলো।
সড়কটির সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা মোস্তফা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানা থেকে ড্রাইডক লিমিটেডের কার্যালয় পর্যন্ত। ড্রাইডক লিমিটেডের সামনে সড়কের সম্পূর্ণ অংশ ভেঙে গেছে। এই অংশে রয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত। এসব গর্তে আটকে যাচ্ছে গাড়ি। এ ছাড়া সড়কের দুটি বেইলি সেতুর মধ্যে কমলের হাট সেতুর (গুপ্তখাল সেতু) একটি অংশেও গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।
সড়কের বেহাল অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ভিআইপি সড়ক নামে আছে, কাজে নেই। বৈদ্যুতিক খুঁটি থাকলেও রাতে অনেক জায়গায় আলো জ্বলে না। পুরো রাস্তায় গর্ত। একটু এদিক-ওদিক হলেই গর্তে গাড়ি পড়ে যায়। গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রতিদিনই নষ্ট হচ্ছে। একদিন গাড়ি চালালে তিন দিন বন্ধ রাখতে হয়।’
দুবাইফেরত প্রবাসী মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে যান চলাচল করে কীভাবে? গাড়ির ভেতর বসে ঝাঁকুনিতে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এখন পুরো শরীরে ব্যথা।’
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব লেদু মিয়া বলেন, ‘ইট-বালু দিয়ে রাস্তা রক্ষা করা যাবে না। বৃষ্টির পানিতে তা উঠে যায়। লোক দেখানো কাজ না করে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা উচিত।’
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে এই সড়কের অবস্থা বেহাল। বিনিয়োগকারীরা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এসে যখন রাস্তার এই হাল দেখেন, তখন তাঁদের মধ্যে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। সড়কটি সংস্কার করা খুবই জরুরি।’
এদিকে বিমানবন্দর সড়ক সম্প্রসারণের কাজটিও গত ২০ মাসে শেষ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এ জন্য করপোরেশনের প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করেছেন ঠিকাদারেরা।
এসব ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সিটি করপোরেশনের মেয়র মন্জুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
এরপর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এয়াকুব নবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। নিয়মিত ভরাট করে দেওয়া হচ্ছে খানাখন্দগুলো। আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু বৃষ্টির জন্য সংস্কারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।’
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২০১০ সালে এ সড়কের আট হাজার ফুট দৈর্ঘ্য পর্যন্ত চার লেনে সম্প্রসারণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয় করপোরেশন। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। এরপর চার ঠিকাদারকে সড়ক সম্প্রসারণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর। কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে কাজই শুরু করতে পারেননি ঠিকাদারেরা। এরপর দুবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৭০ শতাংশ।
এ ব্যাপারে প্রকল্পের অন্যতম ঠিকাদার লোকমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমস্যা আমাদের না। সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গিয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয় থেকে পুনঃ অনুমোদন নিতে হয়। এ জন্য আমরা নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে পারিনি। এখন কার্পেটিং ছাড়া আমাদের সব কাজ শেষ। বৃষ্টির পর তা করে দেব।’
সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এয়াকুব নবী জানান, তহবিল সংকটের কারণে প্রথম আট মাস সড়ক সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এখন নতুন করে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।

No comments:

Post a Comment