Pages

Friday, July 25, 2014

পাঠ্যবইয়ে নিম্নমানের কাগজ, অর্থ লোপাটের পাঁয়তারা

গত বছর ৮৪ কোটি টাকার অনিয়ম

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে নিম্নমানের কাগজ দিয়ে এবারও পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে গত বছর (২০১৪ শিক্ষাবর্ষ) পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর ক্ষেত্রেও নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ আছে কার্যাদেশপ্রাপ্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দরপত্রের কারিগরি নির্দেশনা (টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন) অনুসারে পাঠ্যপুস্তকের জন্য যে ধরনের কাগজ ব্যবহারের শর্ত ছিল, সে কাগজের প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছিল ৭২ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবে যে মানের কাগজ ব্যবহার করা হয়, সেটার টনপ্রতি মূল্য ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা। ৩০ কোটি বইয়ের জন্য মোট কাগজ লেগেছে ৬৭ হাজার মেট্রিক টন। এভাবে টনপ্রতি ১২ হাজার ৫০০ টাকা করে শুধু কাগজ বাবদই প্রায় ৮৪ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আগামী বছরের (২০১৫ শিক্ষাবর্ষ) বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর ক্ষেত্রেও একই তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি। গত বুধবার সমিতির নয়াপল্টনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করা হয়। এর প্রমাণ হিসেবে এনসিটিবির গুদাম থেকে সংগৃহীত কাগজের নমুনা বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) থেকে পরীক্ষা করে তার ফলাফল সাংবাদিকদের দেখানো হয়।
তাতে দেখা যায়, দরপত্রের শর্তানুযায়ী কাগজের উজ্জ্বলতা (ব্রাইটনেস) ৮০ শতাংশ থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু নমুনায় তা আছে ৬৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একইভাবে কাগজের পুরুত্ব (জিএসএম) ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও নমুনায় আছে ৫৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আর ব্যবহৃত কাগজ কতখানি মজবুত, তার নির্দেশনাকারী ‘বার্স্টিং ফ্যাক্টর’ যেখানে ন্যূনতম ১২ শতাংশ থাকার কথা, তা আছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান শহীদ সেরনীয়াবাতের মতে, ২০১৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর জন্যও যেসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই উন্নত মানের কাগজ তৈরির ক্ষমতা রাখে না।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম মিঞা দাবি করেন, এনসিটিবির গুদামে নিম্নমানের কাগজ আসার কোনো সুযোগ নেই। মাননিয়ন্ত্রণের জন্য এনসিটিবির নিজস্ব পরিদর্শক দল আছে।
কিন্তু শহীদ সেরনীয়াবাত অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে এনসিটিবির মাননিয়ন্ত্রণ কমিটি নিম্নমানের কাগজেরও সনদ দিয়ে দেয়। আর এই কমিটিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের মুদ্রণশিল্প সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই। তাই এ কমিটির ওপর মুদ্রণ শিল্প সমিতি আস্থা রাখতে পারছে না বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মতো দুর্নীতিপ্রবণ একটি দেশে “অর্থের বিনিময়ে” কথাটি হচ্ছে সবচেয়ে সস্তা। কারণ এটা লিখলে মানুষ খায়। এ রকম কিছু প্রমাণিত হলে আমি চেয়ার ছেড়ে দিব।’
এদিকে নিম্নমান ও বিলম্বে কাগজ সরবরাহ করার জন্য ২০১৪ শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবি যেসব প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছিল, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য তাদের আবার মনোনীত করা হয়েছে বলে জানান মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গাজীপুর পেপার মিল গত বছর দুই হাজার টন কাগজও সময়মতো সরবরাহ করতে পারেনি। সরবরাহে বিলম্ব এবং কাগজের নিম্নমানের জন্য এনসিটিবি এই মিলটিকে সাত লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। এবার সেই প্রতিষ্ঠানকে ছয় হাজার টন কাগজ সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একই কারণে গত বছর পার্ল পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলকে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানকেও পুনরায় সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের বক্তব্য, দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হলে যে সর্বনিম্ন দরদাতা, তাকেই কাজ দিতে হবে। তবে ‘খুব বেশি’ অনিয়ম হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান দুটিকে কেন আবার কাজ দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ‘তাদেরকে তো জরিমানা করাই হয়েছে। আমরা আছি চাপের মধ্যে। সাংবাদিকদের চাপ, মুদ্রণ শিল্প সমিতির চাপ। যারা আমাদের কাজ করে, তাদেরও চাপ আছে।’
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম শাহ আলম মনে করেন, শুধু দরপত্রের কারিগরি নির্দেশনা মেনে চললেই এবিষয়ক যাবতীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই মুদ্রণকাজে ব্যবহৃত কাগজ, কালি ও বাঁধাইয়ের যথাযথ মান নিশ্চিত করার জন্য এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা, মুদ্রণ শিল্প সমিতির প্রতিনিধি এবং সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) ও বিসিএসআইআরের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মাননিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয় সমিতির পক্ষ থেকে।
তবে এনসিটিবির চেয়ারম্যান দাবি করেন, সরকারি ক্রয়নীতি (পিপিআর) অনুযায়ী এ ধরনের কমিটি করার কোনো সুযোগ নেই।

No comments:

Post a Comment