Pages

Saturday, July 26, 2014

অপারেশন ‘সূর্য্যদীঘল বাড়ী’

দেশের শীর্ষ জঙ্গিনেতা শায়খ আবদুর রহমান ধরা পড়েছিলেন ২০০৬ সালের ২ মার্চ। পরের বছরের (২০০৭) ৩০ মার্চ ফাঁসিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সিলেটের একটি বাড়ি থেকে ৩৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে র্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করেছিলেন আবদুর রহমানকে। সেই চূড়ান্ত অভিযানের আগেও চলে দীর্ঘ গোয়েন্দা তৎপরতা। চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা কাহিনির মতোই এই অভিযানের পরতে পরতে ছিল চমকপ্রদ সব ঘটনা। সত্যিকারের গোয়েন্দা অভিযানের আদ্যোপান্ত জানার জন্য পাঠকের রয়েছে অপার কৌতূহল। প্রথম আলোর অপরাধ বিভাগের কামরুল হাসান খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন সেই অভিযান। এরপর র্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান চালিয়ে বের করে এনেছেন আট বছর আগের সেই অভিযানটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।
২০০৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জেএমবির সামরিক প্রধান আতাউর রহমান সানি ধরা পড়ার পর র্যাবের পরবর্তী টার্গেট হন শায়খ আবদুর রহমান। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর কোনো হদিস মেলে না। সানিকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর র্যাব জানতে পারে, ঢাকার বনশ্রীর বাড়ি থেকে পালিয়ে শায়খ রহমান আশ্রয় নেন তাঁর পল্লবীর বাসায়। র্যাব সেখানে হানা দেওয়ার একটু আগেই তিনি চম্পট দেন। তবে সানির কাছ থেকে পাওয়া যায় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লু—জেএমবির মজলিশে শুরা সদস্য হাফেজ মাহমুদ জানে আবদুর রহমান সম্পর্কে অনেক তথ্য। ব্যস, শুরু হয়ে যায় হাফেজ মাহমুদকে গ্রেফতার অভিযান।

র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক কষ্টে তাঁরা জানতে পারেন, হাফেজ মাহমুদ নারকেল ব্যবসায়ী সেজে যশোরে অবস্থান করছে। কর্মকর্তারা তার ফোন নম্বর জোগাড় করেন। কিন্তু ফোনে কথা বলতে চায় না হাফেজ। র্যাবের সোর্স অন্য পরিচয়ে নানা টোপ ফেলতে থাকে। দীর্ঘ দুই মাস চলে ইঁদুর-বেড়াল খেলা। একপর্যায়ে র্যাবের সোর্স বিদেশি এনজিওর লোক পরিচয় দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখায়। বলা হয়, তাদের এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি এনজিও অর্থ সাহায্য দিতে চায়। এবার বরফ গলে। হাফেজ মাহমুদ রাজি হয়ে যায়।
র্যাব সূত্র জানায়, হাফেজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর থেকেই তার মোবাইল ফোনে তীক্ষ নজর রাখা হয়। দেখা যায়, র্যাবের সোর্সের সঙ্গে কথা বলার পরপরই হাফেজ অন্য একটি নম্বরে ফোন করে। কিন্তু তাদের কথা হয় সাংকেতিক ভাষায়। কিছুই বোঝা যায় না। একেক সময় ওই ব্যক্তির অবস্থান থাকে একেক জায়গায়। তবে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়—ওই ব্যক্তিই শায়খ রহমান। কিন্তু তার আগে ধরা দরকার হাফেজ মাহমুদকে।
র্যাব সোর্সের টোপ গিলে হাফেজ রাজি হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগারে আলোচনায় বসা হবে। র্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল গুলজার ফাঁদ পাতেন ওই পাঠাগার ও তার আশপাশে। ওই দিন ভোরবেলা হাফেজ মাহমুদ যশোর থেকে নৈশকোচে ঢাকায় এসে নামে, সে খবরও পেয়ে যায় র্যাব। শুরু হয় গোয়েন্দাগিরির খেলা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন পাঠাগারের সিঁড়ি ও প্রবেশমুখে র্যাব সদস্যরা হকার সেজে, টুপিবিক্রেতা সেজে বসে পড়েন।
বেলা সাড়ে ১১টার সময় দাড়িহীন, রঙিন চশমা আঁঁটা, সবুজ শার্ট পরা হাফেজ মাহমুদ আসে পাঠাগারের কাছে। সোর্সের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্র তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাঠাগারের ভেতরে। সেখানে ঘিরে ফেলেন কর্নেল গুলজার ও মেজর আতিক। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয় নিচে রাখা গাড়ির কাছে। একফাঁকে পালানোরও চেষ্টা করে হাফেজ। কিন্তু ব্যর্থ হয়।
তখনই শুরু হয় প্রবল জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু হাফেজ অটল। শায়খ রহমানের অবস্থান সে কিছুতেই জানাবে না। একপর্যায়ে শায়খের ফোন নম্বর জানাতে রাজি হয় সে। তার হাত থেকে মোবাইল সেট কেড়ে নিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা দেখেন, একটি নম্বরে বারবার কথা বলা হয়েছে। র্যাবের আইটি শাখার মেজর জোহা খোঁজ করে দেখেন, এই নম্বরটি সিলেটের এমসি কলেজ টাওয়ার থেকে আসছে এবং টাওয়ারের আট বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই ফোনটির অবস্থান। র্যাব মহাপরিচালক আবদুল আজিজ সরকারকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি সিলেটে র্যাব-৯-এর
অধিনায়ক লে. কর্নেল মোমিনকে নির্দেশ দেন, টাওয়ার থেকে আট বর্গকিলোমিটার দ্রুত ঘেরাও করে ফেলতে। কর্নেল মোমিন, মেজর শিব্বির ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হায়দার তখনই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন।
ঢাকা থেকেও রওনা হয় র্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল গুলজার উদ্দিনের নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের একটি দল। ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে তাঁরা ঢাকা থেকে বের হয়ে সিলেট পৌঁছান রাত আটটায়। ওই দলে আরও ছিলেন মেজর আতিক, মেজর মানিক, মেজর জাভেদ, মেজর ওয়াসি, ক্যাপ্টেন তানভির ও ক্যাপ্টেন তোফাজ্জল। তাঁরা
পৌঁছানোর আগেই সিলেট র্যাবের প্রায় আড়াই শ সদস্য নগরের টিলাগড় ও শিবগঞ্জের ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার প্রতিটি সড়ক ও গলিতে অবস্থান নেন। এদের সঙ্গে ঢাকার বাহিনী যোগ দিয়ে রাত ১০টা থেকে শুরু করে চিরুনি অভিযান। আস্তে আস্তে পরিধি কমিয়ে এনে টিলাগড়, শাপলাবাগ, কল্যাণপুর, কালাশিল ও বাজপাড়া এলাকার প্রতি বাড়িতে শুরু হয় তল্লাশি।
তল্লাশি চলাকালে র্যাবের হাতে থাকে শায়খ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের ছবিসংবলিত লিফলেট। রাত ১২টার দিকে সিলেট নগর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে টুলটিকর ইউনিয়নের ৩ নম্বর
ওয়ার্ডের পূর্ব শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় আবদুস সালাম সড়কের ২২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে প্রথম বাধা পায় র্যাব। এক ব্যক্তি ছুরি হাতে তেড়ে এসে বলে, এগোলে খারাপ হবে। এরপর যা বোঝার বুঝে ফেলে র্যাব। গোটা অভিযান তখন কেন্দ্রীভূত হয় এই বাড়ি ঘিরে। এই বাড়ির নাম ‘সূর্য্যদীঘল বাড়ী’।
র্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘিরে ফেলেন সূর্য্যদীঘল বাড়ী। আশপাশের বাড়িতেও অবস্থান নেন অনেকে। নিয়ে আসা হয় ভারী অস্ত্র ও লাইফ সাপোর্ট জ্যাকেট। রাত পৌনে একটার দিকে মাইকে সূর্য্যদীঘল বাড়ীর লোকজনকে বেরিয়ে আসতে বললেও কেউ সাড়া দেয় না। তাদের নীরবতায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। আশপাশের বাড়ির লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে সূর্য্যদীঘল বাড়ির মালিক লন্ডনপ্রবাসী আবদুল হকের ছোট ভাই মইনুল হককে বাইরে থেকে ডেকে আনা হয়। তিনি মুখে মাইক লাগিয়ে ওই বাড়ির ভাড়াটে হূদয়ের নাম ধরে ডেকে দরজা খুলতে বলেন। তাতেও কাজ না হলে স্থানীয় ইউপি সদস্য নূরুন নবীকে দিয়ে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না।
রাত দুইটার দিকে একবার বাড়ির পেছনে দরজা খোলার শব্দ হয়। র্যাব সদস্যরা সচকিত হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধও হয়ে যায়। রাত দুইটা ১০ মিনিটে হঠাৎ করে বাড়ির ভেতর থেকে একজন বয়স্ক মানুষ ভারী গলায় দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করেন। কর্নেল গুলজার তখন আবদুর রহমানের নাম ধরে ডাক দিলে ভেতর থেকে ভারী গলার আওয়াজ আসে, ‘ওই কাফের! তোর মুখে আমার নাম মানায় না, আমাকে মুজাহিদ বল।’
তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, এটিই শায়খ আবদুর রহমানের কণ্ঠ। এভাবে শেষ হয় প্রথম রাত। বুধবার সকাল থেকে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার চেষ্টা। ততক্ষণে ঢাকা থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা সিলেটে হাজির হয়েছেন। টেলিভিশনে শুরু হয়েছে ‘লাইভ’ সম্প্রচার। টিভি সেটের সামনে থিতু হয়ে পড়েছে সারা দেশ।
প্রথমে কিছুক্ষণ কাঁদানে গ্যাস শেল নিক্ষেপ করে অবস্থা বোঝার চেষ্টা চলে। তাতে কাজ হয়নি। এরপর ডাকা হয় সিলেটের দমকলকে। তারা এসে পানি ছিটাতে থাকে বাড়ির ভেতরে। পুরো বাড়ি ভেসে যায় ফায়ার ব্রিগেডের
পানিতে। কিন্তু শায়খ অনড়। কাহিনি আরও লম্বা হতে থাকে। দিন গড়িয়ে রাত আসে।
কাহিনির ভেতরেও থাকে অনেক চমকপ্রদ ঘটনা। র্যাব ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সারা রাত ধরে চেষ্টা চালিয়ে, একাধিকবার দীর্ঘ কথোপকথন চালিয়েও শায়খ
রহমানকে আত্মসমর্পণে রাজি করাতে পারেন না। ততক্ষণে ভোরের আলো ফোটে গেছে। বুধবার সকাল নয়টা সাত মিনিটে বাড়ির ভেতরে হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পর পর চার-
পাঁচটা বিস্ফোরণ ঘটে। দ্রুত নিয়ে আসা হয় দালান ভাঙার যন্ত্রপাতি। সাড়ে নয়টার দিকে ভাঙা হয় দক্ষিণের একটি জানালা। বৈদ্যুতিক কাটার এনে ছাদ ফুটো করা হয়। প্রথমে আয়না লাগিয়ে, পরে রশি দিয়ে ক্যামেরা নামিয়ে দেখা হয়, ভেতরে কী আছে। দেখা যায়, একটা বিছানা থেকে তার বেরিয়ে আছে। শুরু হয় হইচই—নিশ্চয় সারা বাড়িতে বোমা পাতা আছে। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা নিয়ে আসেন বড় বড় বড়শি। ফুটো দিয়ে নামিয়ে বিছানা টেনে তুলে দেখেন, সব ভুয়া—সাজানো আতঙ্ক।
দুপুরের দিকে র্যাবের কাঁদানে গ্যাসে টিকতে না পেরে বেরিয়ে আসেন শায়খের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা। সিলেটের জেলা প্রশাসক এম ফয়সল আলম শায়খের স্ত্রী রুপাকে বলেন, ‘আপনি আপনার স্বামীকে বেরিয়ে আসতে বলুন।’ রুপা বলেন, ‘আমার কথা শুনবেন না। উনি কারও কথা শোনেন না।’ জেলা প্রশাসক পীড়াপীড়ি করলে শায়খের স্ত্রী মুখে মাইক লাগিয়ে বলেন, ‘উনারা বের হতে বলছেন, আপনি বের হয়ে আসেন।’ স্ত্রীর কথায়ও কান দেন না শায়খ।
বুধবার রাতে হঠাৎ শোরগোল পড়ে যায় বাইরে। একজন র্যাব সদস্য আতরের গন্ধ পান। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। তিনি জানান তাঁর ঊর্ধ্বতনকে। সন্দেহ জাগে, শায়খ কি তবে আতর-গোলাপ মেখে আত্মহত্যা করলেন? গন্ধের উৎস খুঁজতে খুঁজতে দেখা গেল, আতর মেখে এসেছেন একজন ফটোসাংবাদিক। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন সবাই। শেষ হয় আরেকটি রাত।
বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট জেলা প্রশাসক চূড়ান্ত হুমকির সুরে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানালে অবশেষে জানালায় এসে উঁকি দেন শায়খ রহমান। বেরিয়ে আসতে রাজি হন তিনি। কিন্তু একটি শর্ত দেন। বলেন, ধরা দেওয়ার আগে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। সেই শর্তে রাজি হয়ে যান অভিযানকারীরা। এরপর ধরা দেন শায়খ। কিন্তু তাঁকে আর কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
শায়খকে নিয়ে প্রথমে বসানো হয় সিলেটে র্যাবের কার্যালয়ে। শায়খের স্ত্রীকে জানানো হলো, আপনার স্বামী বের হয়ে এসেছেন। স্ত্রী অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘উনি না শহীদ হতে চেয়েছিলেন! কই, হলেন না যে!’

No comments:

Post a Comment