গুগল ঘেঁটে জানা গেল ‘বেলো হরিজন্তে’ শব্দদ্বয়ের অর্থ ‘অপরূপ দিগন্ত’। শনিবার বেলো হরিজন্তের এস্তাদিও মিনেইরোতে ইরানের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়টাকে কি ‘অপরূপ’ বলা যাবে? কিংবা দলের ‘প্রাণভোমরা’ লিওনের মেসির খেলা কি ‘অপরূপ’ হয়েছে? অধিকাংশের উত্তরই হবে নেতিবাচক। যদি বলা হয়, খেলার অন্তিম মুহূর্তে মেসির গোলটা কি ‘অপরূপ’ ছিল? এবার কেবল আর্জেন্টিনার সমর্থকই নন, সুন্দর ফুটবলের পূজারি যে কেউ বলবেন—‘অবশ্যই!’
এবার বিশ্বকাপে বড় ও ছোট দলের পার্থক্য এবার এতটাই কমে এসেছে যে অনেকে ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখছেন—পেছনের বিশ্বকাপগুলোয় এমনটা ঘটেছে কি না! ইতিহাসে চোখ বুলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অন্যবার দু-একটি ছোট দল হয়তো চমক দেখায়, তবে একসঙ্গে এত দল নয়! ব্রাজিল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের দুই চক্রও শেষ হয়নি। অথচ কোস্টারিকা, কলম্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চিলি যে ঝলক দেখাল, দর্শকদের রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার জোগাড়! আরও একটি মিল—চারটি দেশের নামের আদ্যক্ষরও ‘সি’! অবশ্য ইরানের নামে কোনো ‘সি’ নেই। তাতে কী! আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এশিয়ার দলটিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, ব্রাজিল বিশ্বকাপে ‘সুপারপাওয়ার’ আর ‘আন্ডারডগের’ পার্থক্য সামান্যই।
গতকাল ইউরোপীয় লিগ মাতানো গঞ্জালো হিগুয়েইন, সার্জিও আগুয়েরো, অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার মতো বড় বড় তারকা ভেদই করতে পারলেন না ইরানের ‘লালদুর্গ’। উল্টো প্রতি-আক্রমণে আর্জেন্টাইনদের হূদকম্পন বাড়িয়ে দিলেন কার্লোস কুইরোজের শিষ্যরা। ৯১ মিনিট পর্যন্ত ইরান আটকে রাখল আর্জেন্টিনাকে। পরাজয় সমতুল্য ড্র নিয়ে যখন সাবেলার শিষ্যদের মাঠ ছাড়া চূড়ান্ত, ঠিক তখনই মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা—জ্বলে উঠলেন জাদুকর! বাঁ পায়ের জাদুতে তিন ইরানি ডিফেন্ডার ও পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা গোলরক্ষক আলিরেজা হাগিগিকে ভেদ করে বল জড়িয়ে দিলেন জালে! এ তো সত্যি জাদুর পরশ—যাঁর ছোঁয়ায় মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল গোটা আর্জেন্টিনা! মেসির ওই গোলে ঘাম দিয়ে জ্বর ছুটল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের!
গত মৌসুমে ক্লাব ফুটবলে অনুজ্জ্বল পারফরম্যান্সের কারণে গুঞ্জন ছিল, বিশ্বকাপের জন্য সেরা খেলাটা নাকি জমিয়ে রেখেছেন মেসি! যদিও দুই ম্যাচে নিজের সেরা খেলাটা খেলেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে যেভাবে দুবারই দলকে উদ্ধার করেছেন, সংকটময় মুহূর্তে হয়েছেন কান্ডারি—তাতে গুঞ্জনটা কিন্তু ধীরে ধীরে সত্যিই হচ্ছে!
এবার বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের জালে দুটি গোলই দিতে পেরেছে আর্জেন্টিনা। আর সেই দুটি গোলের মালিকই মেসি, দুটি গোলই জয়সূচক। দুটি গোলই করেছেন বদলি নামা সতীর্থের সহায়তায়। বসনিয়ার বিপক্ষে মেসিকে পাস দিয়েছিলেন হিগুয়েন। ইরানের বিপক্ষে পাস দিলেন এজকিয়েল লাভেজ্জি। মেসি ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দিতে পারেন বটে, তবে তাঁকে সহায়তা করতে খুব ভালো সহযোগী প্রয়োজন। সেই সহযোগিতা তিনি যথাযথ পাচ্ছেন কি না, সেটি নিয়েই প্রশ্ন।
তবে দিন শেষে জয়, জয়-ই। সে যে ব্যবধানেই হোক না কেন। দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত হওয়ায় নাইজেরিয়ার বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচে ফুরফুরে মেজাজেই নামবেন মেসিরা। তার চেয়েও বড় কথা, আর্জেন্টিনা অধিনায়কের জন্মদিনটা এবার কাটবে অন্যরকমই। গত বিশ্বকাপে যেমন ভালো খেলেও গোল না পাওয়ার আক্ষেপে জন্মদিন পালন করতে হয়েছিল খুদে জাদুকরকে। এবার অন্তত সে রকম হবে না। ২৪ জুন ২৭-এ পা দেওয়া মেসি সতীর্থদের নিয়ে জন্মদিন উদযাপন করবেন পরপর দুই ম্যাচে গোল করার তৃপ্তি নিয়েই! জন্মদিনে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে!

No comments:
Post a Comment